ইসলামে সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন বিশেষ মর্যাদা ও তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিনের ইবাদত, দোয়া ও বিভিন্ন নেক আমলের বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জুমার নামাজ আদায়, আগে মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, সুরা কাহাফ তিলাওয়াত ও নবীজি (সা.)-এর ওপর দরুদ পাঠসহ বেশ কিছু আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ক্ষমা লাভের সুযোগ রয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিন নামাজের আজান হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচাবিক্রি বন্ধ কোরো, তা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝো। এরপর নামাজ শেষ হলে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ৯-১০)
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ ১২টি আমল সম্পর্কে তুলে ধরা হলো—
১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা
জুমার দিন ইসলামে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি দিন। আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
সেগুলো হলো—এই দিনে আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, এই দিনেই তাঁকে পৃথিবীতে অবতরণ করিয়েছেন এবং এই দিনেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো বান্দা আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা কবুল করেন, যদি সেই প্রার্থনা হারাম কোনো বিষয়ের জন্য না হয়। আর এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)
২. ফজরের নামাজে বিশেষ সুরা তিলাওয়াত
জুমার দিনের ফজরের নামাজে নির্দিষ্ট দুটি সুরা তিলাওয়াত করা সুন্নত। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি (সা.) শুক্রবারের ফজরের নামাজে সুরা আস-সিজদা ও সুরা আল-ইনসান তিলাওয়াত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৬৮)
এই দুটি সুরায় আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, পুনরুত্থান, কিয়ামত এবং কিয়ামতের দিন মানুষের সমবেত হওয়ার বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে। জুমার দিনের সঙ্গে এসব ঘটনার সম্পর্ক থাকায় নবীজি (সা.) এ দুটি সুরা পাঠ করতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. জুমার দিন গোসল করা
জুমার দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে গোসল করে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করল, দ্রুততর সময়ে মসজিদে গেল ও (ইমামের) কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ (খুতবা) শুনল, তার জন্য প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব থাকবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)
৪. সুগন্ধি ব্যবহার করা
জুমার দিন পরিচ্ছন্ন পোশাক পরার পাশাপাশি সুগন্ধি ব্যবহার করাও উত্তম আমল। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮০)
৫. আগে মসজিদে প্রবেশ করা
জুমার নামাজের জন্য আগে মসজিদে পৌঁছানো এবং ইমামের কাছাকাছি বসার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, অতঃপর প্রথমে মসজিদে গেল সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে এরপর মসজিদে গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। আর যে এরপর ঢুকল, সে যেন ছাগল কোরবানি করল। এরপর যে ঢুকল, সে যেন মুরগি কোরবানি করল। আর যে এরপর ঢুকল, সে যেন ডিম সদকা করল। অতঃপর ইমাম খুতবার জন্য এলে ফেরেশতারা আলোচনা শোনা শুরু করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪১)
৬. খুতবার সময় সম্পূর্ণ নীরব থাকা
জুমার খুতবা চলাকালে মনোযোগ দিয়ে তা শোনা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা থেকে বিরত থাকা জরুরি। এমনকি কাউকে চুপ থাকতে বলাও অনর্থক কাজ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ইমামের খুতবা দেওয়ার সময় তার সঙ্গীকে বলল, চুপ থাকো, সে একটি অনর্থক কাজ করল।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১৪০১)
৭. খুতবা শোনা ও জুমার নামাজ আদায় করা
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা।
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)
অন্য একটি হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে; যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)
৮. জুমার নামাজে নির্ধারিত সুরা তিলাওয়াত
জুমার নামাজে নির্দিষ্ট কিছু সুরা তিলাওয়াতের কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুই ঈদের নামাজ ও জুমার নামাজে ‘সাব্বিহিসমা রব্বিকাল আলা’ এবং ‘হাল আতা-কা হাদিসুল গা-শিয়াহ’ সুরা দুটি পাঠ করতেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
কোনো কোনো বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জুমার নামাজে সুরা জুমুআ ও সুরা আলা তিলাওয়াত করার কথাও এসেছে।
৯. দোয়া কবুলের বিশেষ সময় অনুসন্ধান
জুমার দিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ দিনে এমন একটি বিশেষ সময় রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে কোনো ভালো কিছু প্রার্থনা করলে তিনি তা কবুল করেন।
জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান কোরো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জুমার দিনের বারো ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে দান করেন। এই মুহূর্তটি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কোরো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)
১০. সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা
জুমার দিনের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ আমল হলো সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে, অতঃপর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ তারগিব, হাদিস : ১৪৭৩; আল-মুসতাদরাক : ২/৩৯৯)
১১. দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফের আমল
জুমার দিন পবিত্রতা অর্জন, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সুগন্ধি ব্যবহার, মসজিদে আগে পৌঁছানো এবং খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনার মাধ্যমে বিশেষ সওয়াব ও গুনাহ মাফের সুযোগ রয়েছে।
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)
১২. বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা
জুমার দিন নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এই দিনে শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এই দিনে সবাইকে বেহুঁশ করা হবে। অতএব, তোমরা এই দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়ো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’
সাহাবিরা জানতে চাইলেন, তাঁদের দরুদ কীভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পেশ করা হবে, অথচ একসময় তাঁর দেহ নিঃশেষ হয়ে যাবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ জমিনের জন্য আমার দেহের ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)
জুমার দিনের আমলের গুরুত্ব
জুমার দিন একজন মুমিনের জন্য ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ সুযোগ। তাই এ দিনে গোসল ও পবিত্রতা অর্জন, সময়মতো মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা, জুমার নামাজ আদায়, সুরা কাহাফ তিলাওয়াত, দোয়া এবং নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠের মাধ্যমে দিনটি অতিবাহিত করা উচিত।
জ/শা