দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চাকরি থেকে অপসারিত উপসহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিনের পুনর্বহালে আর কোনো আইনি বাধা নেই। জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়ে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের করা লিভ টু আপিল প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত। ফলে শরীফ উদ্দিনের চাকরিতে পুনর্বহালের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল থাকল।
শরীফ উদ্দিনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালাহ উদ্দীন দোলন জানান, হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক লিভ টু আপিল করেছিল। পরবর্তী সময়ে সংস্থাটি সেই আবেদন প্রত্যাহারের জন্য আদালতে আবেদন করে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত দুদকের আবেদন মঞ্জুর করেন। এর মধ্য দিয়ে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সুযোগ-সুবিধাসহ শরীফ উদ্দিনের চাকরিতে ফিরে যাওয়ার পথ সুগম হয়েছে।
২০২২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি দুদকের পটুয়াখালী কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক পদ থেকে শরীফ উদ্দিনকে অপসারণ করা হয়। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন তিনি।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত বছরের ৯ জুলাই হাইকোর্ট তার চাকরিচ্যুতির আদেশকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে আদেশটি শুরু থেকেই বাতিল করে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন আদালত। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এ নির্দেশ কার্যকর করতে বলা হয়েছিল।
হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর লিভ টু আপিল করে দুদক। তবে পরবর্তী সময়ে সংস্থাটি আর আবেদনটি পরিচালনা করতে আগ্রহী ছিল না। গত ১৫ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত আবেদনটি খারিজ করেন। আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়, দুদকের পক্ষে উপস্থিত অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড আবেদনটি পরিচালনা না করার নির্দেশনা পাওয়ার কথা জানান। তার বক্তব্যের ভিত্তিতে ‘নট টু প্রসিড’ বা আবেদনটি আর পরিচালনা না করার কারণে লিভ টু আপিল খারিজ করা হয়।
শরীফ উদ্দিনকে চাকরি থেকে অপসারণের ঘটনা ২০২২ সালে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। সে সময় তিনি দুদকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালের ১৬ জুন তাকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়। চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের সময় সরকারি প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে অনিয়মের তদন্ত করে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছিলেন তিনি। দায়িত্ব পালনের কারণে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগ তুলে থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেছিলেন দুদকের তৎকালীন এই কর্মকর্তা।
চাকরি থেকে অপসারণের আদেশে বলা হয়েছিল, দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) বিধিমালা, ২০০৮-এর ৫৪(২) বিধিতে দেওয়া ক্ষমতাবলে তাকে অপসারণ করা হয়েছে। ওই বিধি অনুসারে, তিনি ৯০ দিনের বেতন ও প্রযোজ্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল।
এ বিধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২২ সালের ১৩ মার্চ হাইকোর্টে রিট করেন শরীফ উদ্দিন। এর আগে একই বিধির আওতায় দুদকের আরেক কর্মকর্তা মো. আহসান আলীকে চাকরিচ্যুত করার ঘটনায় বিধিটি বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। তবে ওই রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের করা আপিল আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকায় ২০২২ সালের ২৫ মে শরীফ উদ্দিনের রিটের শুনানি মুলতবি করেন হাইকোর্ট।
পরে ওই আদেশ স্থগিত চেয়ে ২০২২ সালের ১৬ জুন আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন শরীফ উদ্দিন। আহসান আলীর মামলায় বিধি ৫৪(২) বাতিলের রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের আপিলের সঙ্গে শরীফ উদ্দিনের আবেদনটিও শুনানির জন্য ওঠে। ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ আপিল বিভাগ দুদকের আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্টের আগের রায় বাতিল করেন। একই সঙ্গে শরীফ উদ্দিনের লিভ টু আপিলকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বলে উল্লেখ করেন আদালত।
এরপর ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ওই রায়ে দুদকের কর্মচারী বিধিমালার ৫৪(২) বিধি সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ বিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে দুদককে ১২ দফা পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুসরণের কথাও বলা হয়।
পরবর্তী সময়ে শরীফ উদ্দিনের রিট হাইকোর্টে শুনানির জন্য উপস্থাপন করা হয়। প্রাথমিক শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আদালত রুল জারি করেন। চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ৯ জুলাই দেওয়া রায়ে হাইকোর্ট তার চাকরি থেকে অপসারণের আদেশকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করে শুরু থেকেই বাতিল করেন। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সব সুযোগ-সুবিধাসহ তাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দেন আদালত।
আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে দুদকের লিভ টু আপিল প্রত্যাহারের আবেদন মঞ্জুর হওয়ায় হাইকোর্টের সেই রায় বহাল রয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর শরীফ উদ্দিনের দুদকের চাকরিতে ফেরার আইনি পথ খুলেছে।
জ/শা