দুপুর বা রাতের খাবারের পর এক কাপ চা কিংবা কফি পান করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কেউ খাবারের শেষে চা পান করতে পছন্দ করেন, আবার কেউ বিকেলের ক্লান্তি কাটাতে কফির ওপর নির্ভর করেন। তবে প্রশ্ন হলো, খাবারের পর এই দুই পানীয়ের মধ্যে কোনটি হজমের জন্য ভালো? আর এগুলো শরীরে পুষ্টি শোষণের ওপরই বা কী ধরনের প্রভাব ফেলে?
অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য পরিমিত পরিমাণে চা বা কফি পান করা সাধারণত নিরাপদ। তবে খাবারের সঙ্গে বা খাবারের পরপরই এসব পানীয় পান করলে শরীরে আয়রন শোষণের পরিমাণ কমতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের শরীরে আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাঁদের জন্য চা বা কফি পানের সময়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
চা বনাম কফি: কোনটি ভালো?
সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য খাবারের পর চা বা কফি পান করা সাধারণত ক্ষতিকর নয়। তবে উভয় পানীয়তেই ক্যাফেইন ও পলিফেনল নামের কিছু উপাদান রয়েছে, যা শরীরে পুষ্টি শোষণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
চায়ে থাকা কিছু উপাদান শরীরে ‘নন-হিম আয়রন’ (Non-haem iron) শোষণের হার কমিয়ে দিতে পারে। এই ধরনের আয়রন মূলত উদ্ভিদজাত খাবার, যেমন ডাল, শিম ও সবুজ শাকসবজি থেকে পাওয়া যায়। কফিতেও পলিফেনল রয়েছে, যা আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তাই চা বা কফির মধ্যে কোনটি হজমের জন্য বেশি ভালো, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। কোনো পানীয় পানের পর অস্বস্তি না হলে এবং চিনির ব্যবহার সীমিত রাখলে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী যেকোনোটি বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে আয়রন শোষণের বিষয়টি আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চা ও কফি কীভাবে আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলে?
আয়রন বা লৌহ শরীরে হিমোগ্লোবিন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হিমোগ্লোবিন রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়।
খাবার থেকে পাওয়া আয়রন মূলত দুই ধরনের-হিম আয়রন ও নন-হিম আয়রন। প্রাণিজ খাবারে থাকা হিম আয়রন শরীর তুলনামূলক সহজে শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে, উদ্ভিদজাত খাবারে থাকা নন-হিম আয়রন শোষণের হার তুলনামূলক কম এবং বিভিন্ন খাদ্য উপাদানের কারণে তা আরও কমে যেতে পারে।
চা ও কফিতে থাকা পলিফেনল পরিপাকতন্ত্রে নন-হিম আয়রনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এর শোষণ কমিয়ে দিতে পারে। ফলে খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন থাকলেও শরীর তার পুরোটা শোষণ করতে পারে না।
‘আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত ২০২১ সালের একটি গবেষণায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে চা পান করার প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা রয়েছে এমন ব্যক্তি এবং যাঁদের এ সমস্যা নেই-উভয় দলের ক্ষেত্রেই চা পানের কারণে আয়রন শোষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
শরীরে আয়রনের চাহিদা বেশি থাকলেও চায়ের পলিফেনল আয়রন শোষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষণায় উঠে আসে।
যাঁদের খাদ্যতালিকায় প্রধানত উদ্ভিদজাত খাবার রয়েছে অথবা যাঁদের শরীরে আগে থেকেই আয়রনের মাত্রা কম, তাঁদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চা বা কফি পানের আগে কতক্ষণ অপেক্ষা করবেন?
আপনি যদি সুস্থ থাকেন এবং সুষম খাবার খান, তাহলে প্রতিবার খাবারের পর চা বা কফি পান করা থেকে বিরত থাকার প্রয়োজন সাধারণত নেই। তবে শরীরে আয়রনের ঘাটতি থাকলে কিংবা আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতায় ভুগলে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পর চা বা কফি পান করার আগে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করার কথা বিবেচনা করতে পারেন। এতে আয়রন শোষণের ওপর পানীয় দুটির প্রভাব কমানো সম্ভব হতে পারে।
যাঁরা আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত। চা ও কফি আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে বলে ওষুধ গ্রহণের সঙ্গে এসব পানীয় পানের মধ্যে উপযুক্ত সময়ের ব্যবধান রাখা জরুরি।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা এনএইচএসের (NHS) পরামর্শ অনুযায়ী, ফেরাস সালফেট (Ferrous sulphate) আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পর চা বা কফি পান করার আগে অন্তত দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করা উচিত। এতে শরীরে আয়রন শোষণে বাধা কমানো যায়।
অ্যাসিডিটি বা ডায়াবেটিস থাকলে কী করবেন?
চা ও কফি সবার শরীরে একইভাবে প্রভাব ফেলে না। যাঁদের অ্যাসিডিটি বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় অস্বস্তি বাড়াতে পারে। চা বা কফি পানের পর বুকজ্বালা, টক ঢেকুর কিংবা অন্য উপসর্গ বেড়ে গেলে পানীয় দুটির পরিমাণ কমানো বা এড়িয়ে চলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ ছাড়া চা বা কফিতে অতিরিক্ত চিনি মেশানো এড়িয়ে চলা ভালো। বিশেষ করে ডায়াবেটিস থাকলে কিংবা ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে চিনির পরিমাণ সীমিত রাখা জরুরি।
তাহলে খাবারের পর কোনটি পান করবেন?
খাবারের পর চা নাকি কফি-কোনটি ভালো, তার নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে পছন্দ, ক্যাফেইন সহ্য করার ক্ষমতা এবং পানীয় পানের পর শরীর কেমন অনুভব করে, তার ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে।
তবে চা ও কফি উভয়ই শরীরে আয়রন শোষণ কমাতে পারে। যাঁদের আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, যাঁরা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন অথবা আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন, তাঁদের খাবার কিংবা ওষুধ গ্রহণের সঙ্গে চা-কফি পানের পর্যাপ্ত সময়ের ব্যবধান রাখা উচিত।
সবশেষে, খাবারের পর চা বা কফি পান করার ক্ষেত্রে শুধু হজম নয়, শরীরের পুষ্টির চাহিদা, বিদ্যমান শারীরিক সমস্যা এবং পানীয়তে চিনির পরিমাণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
জ/উ