রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ছয় মুখোশধারীর হামলায় ছেলের পেটে চাপাতির কোপ, বাবার পায়ে গুলি। পুলিশের ধারণা, কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধের জেরেই ১৫ অক্টোবরের এ হামলা। অথচ এর আগের তিন মাসে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬ হাজার ৮৮ জন; শুধু মোহাম্মদপুর থেকেই ২ হাজার ১৯৬ জন। এত গ্রেপ্তারের পরও গ্যাং-সহিংসতা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ কেন থামছে না? বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীদের পাশাপাশি গ্যাংয়ের সংগঠক, অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা এবং কিশোরদের পুনর্বাসন নিশ্চিত না করলে শুধু গ্রেপ্তারে অপরাধের চক্র ভাঙা কঠিন।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, হাতিরঝিল, শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় এসব গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী, পরোয়ানাভুক্ত আসামি ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ধরতে নিয়মিত অভিযান চলছে।
ইবনে মিজান জানান, মোহাম্মদপুর ও আদাবরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, আগের তুলনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধে পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে।
‘হিরো’ বানানোর ঝুঁকি : ‘ইতালিয়ান জুয়েল’-এর মতো চটকদার উপাধিতে অপরাধীদের পরিচিত করার প্রবণতা কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক।
তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলন বা গণমাধ্যমে গ্যাং সদস্যদের উপাধি ও দলীয় পরিচিতি অতিরিক্ত প্রচার করলে অন্য কিশোরদের মধ্যে ‘হিরো’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হতে পারে। অপরাধীরাও এসব পরিচিতি নিজেদের প্রভাব ও চাঁদাবাজির দাপট বাড়াতে ব্যবহার করতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচয় প্রকাশ করা গেলেও সবার ছবি ও কথিত উপাধি প্রচারে সতর্ক থাকা উচিত।
তাঁর মতে, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী তরুণদের আবেগ ও স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে। গ্রেপ্তারের পর কেউ দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ালে শাস্তি এড়ানোর ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে জামিন আদালতের আইনি প্রক্রিয়া। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মানসম্মত তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
১,৩৩৩ গ্যাংয়ের খসড়া তালিকা : কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, সংগঠক ও কথিত পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তে তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদরদপ্তর। দ্য ডেইলি স্টার-এর ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৩৩৩টি গ্যাং, ২১৩ জন দলনেতা বা সংগঠক এবং ২৭ জন কথিত পৃষ্ঠপোষকের খসড়া তালিকা করেছে। যাচাই শেষে তালিকাটি পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠানো হবে। ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে সন্দেহভাজন ১৭৪ সদস্যকে আটক করেছে সংস্থাটি।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, অপরাধের রেকর্ড নেই-এমন ব্যক্তিদের তালিকায় রাখা হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। তাঁর ভাষায়, “আমরা কঠোর হতে পারি, কিন্তু নিষ্ঠুর হতে পারি না।” গ্যাংয়ের পেছনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কারও পৃষ্ঠপোষকতা আছে কি না, তা-ও তদন্ত করা হবে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩০৭টি কিশোর গ্যাংয়ের হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৩টি, ঢাকা রেঞ্জে ৭৮টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৪টি এবং ডিএমপিতে ৪১টি। তবে কয়েকটি মহানগর ও রেঞ্জে কোনো গ্যাংয়ের তথ্য নেই, যা তালিকার পূর্ণতা ও হালনাগাদ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৪৮টি গ্যাংয়ের ৫৭৭ তালিকাভুক্ত সদস্যের বিরুদ্ধে ৬৯টি ফৌজদারি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি মামলা গ্যাংগুলোর পারস্পরিক সংঘাতসংক্রান্ত।
আটক নয়, প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ : সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার পর কুমিল্লায় ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮টি থানা ও গোয়েন্দা শাখা সমন্বিত অভিযান শুরু করে। ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৮১১ সন্দেহভাজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটকের তথ্য পাওয়া যায়। তাঁদের অনেককে পরিবারের মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে প্রশ্ন উঠেছে, অপরাধে জড়িত ব্যক্তি এবং কেবল সন্দেহভাজন হিসেবে তালিকাভুক্ত কিশোরদের আলাদা করার প্রক্রিয়া কতটা নির্ভুল।
মোহাম্মদপুরে গত ১৫ অক্টোবরের হামলায় পুলিশের ধারণা, ‘পাটালি’ ও ‘সাজ্জাদ’ নামে দুটি চক্রের পুরোনো বিরোধ কাজ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব চক্র মাদক কারবার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়িত; বয়সে বড় তরুণেরা কিশোরদের ব্যবহার করে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. উমর ফারুক বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করে সমস্যার সমাধান হবে না। গ্যাংয়ের সংগঠক, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন।
অপরাধ দমনের সাফল্য শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যায় নয়; অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমছে কি না, মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে কি না এবং পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না-তা দিয়েই স্থায়ী নিরাপত্তার অগ্রগতি পরিমাপ করতে হবে।
জ/বা