দুই দশকে মজুরি আন্দোলনে রক্তপাত: নেই হতাহত-গ্রেপ্তারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব

খন্দকার হানিফ রাজা

জাতীয়

2026-10-29T19:02:22+06:00
2026-10-29T19:02:22+06:00
বৃহস্পতিবার ● ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
জাতীয়
দুই দশকে মজুরি আন্দোলনে রক্তপাত: নেই হতাহত-গ্রেপ্তারের পূর্ণাঙ্গ হিসাব
২০০৬-২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক নিহত ও আহত; মামলায় হাজারো আসামি, প্রকৃত সংখ্যা অজানা
খন্দকার হানিফ রাজা
⏲ ৭:০২ পিএম | ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
সংগৃহীত ছবি
গত ২০০৬ সালে গাজীপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রমিক নিহত, ২০২৩ সালে মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ গেল আঞ্জুয়ারা খাতুনের, ২০২৪ সালে আশুলিয়ায় নিহত হলেন কাউসার হোসেন খান। সর্বশেষ ২০২৬ সালের অক্টোবরে উত্তরায় সংঘর্ষে আহত ৫০ জন, তাঁদের ১৯ জনই পুলিশ সদস্য। বকেয়া বেতন ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে দুই দশক ধরে রাজপথে এমন রক্তপাত, মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটলেও কতবার সংঘর্ষ হয়েছে, কতজন আহত-নিহত হয়েছেন, আর কত শ্রমিক গ্রেপ্তার হয়েছেন-তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নেই। 

বকেয়া বেতন, ওভারটাইমের টাকা ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাজপথে নেমে বারবার পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন পোশাকশ্রমিকেরা। কখনো গাজীপুর, কখনো আশুলিয়া-সাভার, কখনো ঢাকার মিরপুর কিংবা উত্তরা-দুই দশকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন ঘিরে ঘটেছে প্রাণহানি, আহত হয়েছেন শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সংঘর্ষের পর শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। অথচ ২০০৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ঠিক কতবার সংঘর্ষ হয়েছে, কতজন আহত-নিহত এবং কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব নেই।

গত ২০০৬ সালের মে মাসে গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় বকেয়া বেতন, ওভারটাইম ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন হয়। ২১ মে গাজীপুরের শ্রীপুরে এফএম সোয়েটার কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে একজন শ্রমিক নিহত হন। দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ঘটনায় প্রায় ২০০ শ্রমিক ও পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। ২৩ মে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়ে। ওই দিনের সহিংসতায় অন্তত ১০০ জন আহত এবং বহু কারখানা ও যানবাহন ভাঙচুরের খবর প্রকাশিত হয়। একই দিনে চীনা গার্মেন্টসের শ্রমিক স্বপনের মৃত্যুর খবরও আসে। তবে তাঁর মৃত্যু পুলিশের গুলিতে নয়, কারখানার ভেতরে সহকর্মীদের মারধরের পর হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যম জানায়। ওই বছরের অক্টোবরে ১০টি মামলায় সাত হাজারের বেশি মানুষকে আসামি করার খবর প্রকাশিত হয়। এটি গ্রেপ্তারের সংখ্যা নয়।

গত ২০০৭ সালের মে মাসে গাজীপুরের টঙ্গীতে বকেয়া বেতন ও ওভারটাইমের দাবিতে আন্দোলনে একজন নারী শ্রমিক নিহত এবং প্রায় ৬০ জন আহত হন বলে রয়টার্স জানায়। পরদিন একজন শ্রমিককে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। একই ঘটনার পর ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা করার তথ্যও সবার নজরে আসে। মামলার আসামি হওয়া মানেই গ্রেপ্তার হওয়া নয়।

গত ২০১০ সালে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই সময় শ্রমিক অসন্তোষে প্রাণহানির ঘটনায় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানায়। গত ২০১৮ সালের শেষে নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর বৈষম্যের অভিযোগে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হন। ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়ামের প্রতিবেদনে ৬৫ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও ফৌজদারি অভিযোগের তথ্য রয়েছে। একই প্রতিবেদনে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৬০০ শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়। গত ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে ন্যূনতম মজুরি ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে গাজীপুর ও আশুলিয়ায় আন্দোলন তীব্র হয়। ৮ নভেম্বর গাজীপুরে পুলিশের গুলিতে পোশাকশ্রমিক আঞ্জুয়ারা খাতুন নিহত হন। ওই দিনের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন।

পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে একটি মামলায় আটজনের নামের পাশাপাশি ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করার তথ্য রয়েছে। আরেক মামলায় ২৯ জনের নামের সঙ্গে ৮৫০ থেকে ৯০০ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। 

গত ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ায় শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সংঘর্ষে কাউসার হোসেন খান নিহত হন। ঘটনায় অন্তত ৪১ জন আহত হন; তাঁদের মধ্যে ৩০ জন শ্রমিক ও ১১ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন।

সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর উত্তরার রাজলক্ষ্মী এলাকায় বকেয়া বেতন ও সর্বনিম্ন মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। শিল্প পুলিশের দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং এক সদস্যের হাত ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা হয়নি বলে পুলিশ জানায়।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন সময়মতো পরিশোধ, মজুরি নিয়ে বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং শ্রমিকদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রতিটি সংঘর্ষে আহত, নিহত, গ্রেপ্তার ও মামলার তথ্য সংরক্ষণে জাতীয় ডেটাবেস প্রয়োজন। তা না হলে দুই দশকের শ্রমিক আন্দোলনের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব অজানাই থেকে যাবে।

জ/বা


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত