হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পেতে বড় কোনো স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি একটি সহজ সূচকও কাজে আসতে পারে। শরীরচর্চা শেষ করার পর হৃৎস্পন্দন কত দ্রুত কমে আসে, তা থেকে হৃদযন্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই সূচককে বলা হয় ‘হার্ট রেট রিকভারি’ (এইচআরআর)। তবে এটি একা হৃদরোগ শনাক্ত করতে পারে না।
শারীরিক পরিশ্রমের সময় পেশিতে অক্সিজেন ও রক্তের চাহিদা বাড়ে। এ চাহিদা পূরণে হৃদযন্ত্র দ্রুত স্পন্দিত হয়। ব্যায়াম বন্ধ করার পর হৃৎস্পন্দন ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কত দ্রুত তা কমছে, সেটিই হার্ট রেট রিকভারি দিয়ে পরিমাপ করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় হৃদযন্ত্রের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৯ সালে প্রকাশিত একটি বহুল আলোচিত গবেষণায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ ব্যক্তিকে ছয় বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, ব্যায়ামের পর যাঁদের হৃৎস্পন্দন তুলনামূলক ধীরে কমছিল, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি ছিল। গবেষকেরা ব্যায়াম-পরবর্তী হৃৎস্পন্দন কমার গতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তবে হৃৎস্পন্দন ধীরে কমলেই কারও হৃদরোগ আছে বা তাঁর মৃত্যুঝুঁকি নিশ্চিতভাবে বেশি-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা এবং পরিমাপের পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলে।
পরিমাপের জন্য ব্যায়ামের ঠিক আগে নয়, ব্যায়াম শেষ করার পর হৃৎস্পন্দনের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে হবে। সাধারণভাবে পদ্ধতিটি হলো-
১. নিরাপদ ও পরিচিত ব্যায়াম শেষ করার পর নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হৃৎস্পন্দন মাপুন।
২. ব্যায়াম বন্ধ করার এক মিনিট পর আবার হৃৎস্পন্দন মাপুন। এই সময় বিশ্রাম নেওয়ার ধরনও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. প্রথম পরিমাপ থেকে এক মিনিট পরের পরিমাপের সংখ্যা বাদ দিন। পাওয়া পার্থক্যই হলো এক মিনিটের হার্ট রেট রিকভারি।
উদাহরণস্বরূপ, ব্যায়াম শেষে হৃৎস্পন্দন প্রতি মিনিটে ১৪০ বার এবং এক মিনিট পর ১২০ বার হলে হার্ট রেট রিকভারি হবে ২০ বিট বা প্রতি মিনিটে ২০ বার কমা।
হার্ট রেট রিকভারির ক্ষেত্রে একটিমাত্র সংখ্যা সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। প্রচলিত কিছু ক্লিনিক্যাল মানদণ্ডে ব্যায়াম বন্ধের এক মিনিট পর হৃৎস্পন্দন ১২ বিটের বেশি কমাকে একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। আবার কিছু পরীক্ষাপদ্ধতিতে ১৮ বিট বা তার বেশি কমাকে ভালো লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বিশ্রাম নেওয়ার ধরন, ব্যায়ামের তীব্রতা এবং পরীক্ষার প্রোটোকল অনুযায়ী এই সীমা বদলে যায়।
তাই এক মিনিটে হৃৎস্পন্দন ১২ বিটের কম কমলেই হৃদযন্ত্র দুর্বল-এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে, হৃৎস্পন্দন বেশি কমলেই হৃদযন্ত্র সম্পূর্ণ সুস্থ, সেটিও নিশ্চিত করে বলা যায় না। ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা হৃদযন্ত্রের কর্মক্ষমতা ও সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো ও সাঁতারের মতো অ্যারোবিক ব্যায়াম ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত করা যেতে পারে। তবে ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা নিজের বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
যাঁরা দীর্ঘদিন ব্যায়াম করেননি, যাঁদের আগে থেকেই কোনো রোগ রয়েছে বা যাঁরা নতুন করে কঠোর ব্যায়াম শুরু করতে চান, তাঁদের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা বা চাপ, মাথা ঘোরা কিংবা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসা নিতে হবে।
হার্ট রেট রিকভারি হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি সহায়ক সূচক, চূড়ান্ত রোগনির্ণয়ের বিকল্প নয়। এক মিনিটের এই পরিমাপের ফলকে বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য উপসর্গের সঙ্গে মিলিয়ে মূল্যায়ন করাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।
জ/উ