ডেটাভিত্তিক কৌশলে বদলাচ্ছে বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিং

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

প্রযুক্তি

2026-10-20T13:05:11+06:00
2026-10-20T13:05:11+06:00
মঙ্গলবার ● ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
প্রযুক্তি
ডেটাভিত্তিক কৌশলে বদলাচ্ছে বাংলাদেশের ডিজিটাল মার্কেটিং
তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
⏲ ১:০৫ পিএম | ২০ অক্টোবর, ২০২৬ | মঙ্গলবার
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে ডেটাভিত্তিক বিজ্ঞাপন কৌশলের গুরুত্বও বাড়ছে। শুধু ফেসবুকে বিজ্ঞাপন বুস্ট করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানোর পরিবর্তে এখন সম্ভাব্য ক্রেতাদের আচরণ বিশ্লেষণ, সঠিক অডিয়েন্স নির্বাচন এবং বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্ত রিটার্ন মূল্যায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন বিপণনসংশ্লিষ্টরা।

দেশের অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মাসের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন চালিয়ে বিক্রি বাড়ানোর প্রত্যাশা করে। কিন্তু মাস শেষে দেখা যায়, বিজ্ঞাপনে অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত বিক্রি কিংবা সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এতে প্রশ্ন উঠছে, বিজ্ঞাপন কার্যকর হচ্ছে না, নাকি বিজ্ঞাপন পরিচালনার কৌশলেই রয়েছে মৌলিক দুর্বলতা।

ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, শুধু সাধারণ বুস্টিং কিংবা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া বিজ্ঞাপন চালিয়ে এখন আর প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা কঠিন। কোন ধরনের অডিয়েন্স বিজ্ঞাপনে সাড়া দিচ্ছে, কোন বার্তা ও কনটেন্ট বেশি কার্যকর হচ্ছে এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আগ্রহী মানুষের কতজন শেষ পর্যন্ত ক্রেতায় পরিণত হচ্ছেন-এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

বিজ্ঞাপনের খরচ নয়, রিটার্নও গুরুত্বপূর্ণ
পেইড বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ব্যয়ের বিপরীতে প্রকৃত ফলাফল নির্ধারণ করা। বিজ্ঞাপনে কত টাকা খরচ হয়েছে, তা জানা গেলেও সেই বিনিয়োগ থেকে কতটা আর্থিক রিটার্ন এসেছে, সে বিষয়ে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো রিটার্ন অন অ্যাড স্পেন্ড (ROAS), অর্থাৎ বিজ্ঞাপনে ব্যয় করা অর্থের বিপরীতে অর্জিত আয়।

একটি বিজ্ঞাপনে হাজার হাজার ক্লিক এলেও প্রত্যেক ব্যবহারকারী পণ্য কিনবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার কেউ বিজ্ঞাপন দেখার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নাও নিতে পারেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় অডিয়েন্স নির্বাচনের সমস্যা। প্রথমবার কোনো ব্র্যান্ডের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ব্যক্তি এবং আগে থেকেই ব্র্যান্ডটির পণ্য সম্পর্কে জানা ব্যক্তির ক্রয়-সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া এক নয়।

সব ধরনের মানুষের কাছে একই বিজ্ঞাপন পৌঁছে দেওয়ার ফলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের একটি বড় অংশের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এতে বিজ্ঞাপনের বাজেট অপচয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য বিক্রি, সময় এবং সঠিক ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও নষ্ট হতে পারে।

ডেটা বিশ্লেষণে নির্ধারিত হয় পরবর্তী কৌশল
ডেটাভিত্তিক মার্কেটিংয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো অনুমানের পরিবর্তে আগের বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের ফলাফল, ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীদের আচরণ এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের আগ্রহ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা।

কোন বিজ্ঞাপনে বেশি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, কারা ওয়েবসাইট পরিদর্শন করছেন, কারা সরাসরি যোগাযোগ করছেন এবং শেষ পর্যন্ত কারা প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত হচ্ছেন-এসব তথ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।

তবে প্রতিটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য ও কার্যপদ্ধতি আলাদা। ফলে সব মাধ্যমে একই কৌশল প্রয়োগ না করে প্ল্যাটফর্মভেদে বিজ্ঞাপন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

গুগল অ্যাডস মূলত তখন কার্যকর ভূমিকা রাখে, যখন কোনো সম্ভাব্য ক্রেতা নিজে থেকে গুগলে নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবা খোঁজেন। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর বিদ্যমান চাহিদা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ থাকে।

অন্যদিকে, মেটা অ্যাডসের মাধ্যমে নতুন সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি আগে থেকেই কোনো ব্র্যান্ড বা পণ্যের প্রতি আগ্রহ দেখানো ব্যবহারকারীদের পুনরায় লক্ষ্য করা যায়।

ইউটিউব অ্যাডস ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমে পণ্য বা সেবার বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা তুলে ধরতে সহায়তা করে। লিংকডইন অ্যাডসের মাধ্যমে করপোরেট পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বা বিটুবি (B2B) সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের কাছে পৌঁছানো যায়। অন্যদিকে, টিকটক অ্যাডস স্বল্পদৈর্ঘ্যের ও ট্রেন্ডভিত্তিক ভিডিওর মাধ্যমে বিশেষ করে তরুণ অডিয়েন্সের দৃষ্টি আকর্ষণের সুযোগ তৈরি করে।

তাই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা শুধু কোন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে না। বরং সঠিক অডিয়েন্স নির্বাচন, উপযুক্ত সময় এবং কার্যকর বার্তার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ডেটাভিত্তিক কৌশলে ভাইজার এক্স
ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান ভাইজার এক্সের (VISER X) কার্যপদ্ধতিতেও ডেটা বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির কৌশল অনুযায়ী, বিজ্ঞাপন পরিচালনার আগে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিযোগিতা, আগের ক্যাম্পেইনের ফলাফল এবং সম্ভাব্য গ্রাহকদের আচরণ বিশ্লেষণ করা হয়।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়, কোন বার্তা কোন মাধ্যমে এবং কোন ধরনের অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।

এর একটি উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত হোম লোন ফাইন্যান্সিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে। ওই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত বিজ্ঞাপন চালাত। তাদের সেবার মান ও গ্রাহকদের অভিজ্ঞতাও ভালো ছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপনে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করার পরও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছিল না।

এর অন্যতম সমস্যা ছিল গ্রাহকদের আচরণসংক্রান্ত তথ্য এবং বিজ্ঞাপনের বাজেট কোথায় অপচয় হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব।

ভাইজার এক্স দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে বিজ্ঞাপন অ্যাকাউন্টে থাকা আগের তথ্য ও অ্যানালিটিকস পর্যালোচনা করে। এরপর সম্ভাব্য ক্রেতাদের আচরণ বিশ্লেষণ করে প্রতিটি প্ল্যাটফর্মের অডিয়েন্সের আগ্রহ ও উপযুক্ত টার্গেটিংয়ের পরিধি নির্ধারণ করা হয়। এসব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় ডেটানির্ভর বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইন।

প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই কৌশলের মাধ্যমে ক্যাম্পেইনটিতে ৬৫৪টি কোয়ালিফায়েড লিড এবং ৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ ক্লিক-থ্রু রেট (CTR) অর্জিত হয়। পাশাপাশি, প্রায় ১০ গুণ রিটার্ন অন অ্যাড স্পেন্ড (ROAS) এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৩০০ ডলারের বেশি সম্ভাব্য আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।

ভাইজার এক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে এ ধরনের কৌশল প্রয়োগ করে বিভিন্ন ক্লায়েন্টের ব্যবসায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি রাজস্ব আনতে ভূমিকা রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে ৫০ সদস্যের একটি অভিজ্ঞ দল দেশি-বিদেশি ২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল মার্কেটিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করা অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। সাধারণ বুস্টিংয়ের সঙ্গে পরিকল্পিত ও কৌশলগত বিজ্ঞাপন পরিচালনার পার্থক্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এআইয়ের প্রভাব ও নতুন সম্ভাবনা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বিকাশের ফলে মানুষের তথ্য অনুসন্ধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আসছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভাইজার এক্স প্রচলিত ডিজিটাল মার্কেটিং কৌশলের পাশাপাশি এআই-চালিত সার্চে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৃশ্যমানতা বাড়ানোর নতুন পদ্ধতি যুক্ত করছে।

প্রতিষ্ঠানটির সিইও ও প্রতিষ্ঠাতা ফয়সাল মোস্তফার ভাবনা ও উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের প্রস্তুত রাখা এবং নতুন প্রযুক্তিকে ব্যবসায়িক সমস্যার বাস্তব সমাধানে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির কৌশলে প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু নতুনত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর মাধ্যমে ক্লায়েন্টদের ব্যবসায়িক ফলাফল উন্নত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতিকে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় ডেটার গুরুত্ব
বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু বেশি অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞাপন প্রচার কিংবা পরিকল্পনাহীনভাবে অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান নাও হতে পারে।

কোন ধরনের ক্রেতার কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন, কোন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দিলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব এবং আগের ক্যাম্পেইনের তথ্য কী নির্দেশ করছে-এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ব্যবসায়িক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।

ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু পেইড বিজ্ঞাপন চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং প্রতিটি ক্যাম্পেইন থেকে পাওয়া তথ্য সংগ্রহ, ফলাফল মূল্যায়ন এবং সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

অর্থাৎ, ডিজিটাল মার্কেটিং ক্রমেই অনুমাননির্ভর পদ্ধতি থেকে তথ্য ও বিশ্লেষণভিত্তিক ব্যবস্থাপনার দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে যারা নিজেদের কার্যক্রম মানিয়ে নিতে পারবে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তাদের ব্যবসায়িক অগ্রগতির সুযোগও বাড়বে।

জ/উ


Advertisement
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত