আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে জয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নিজের জয়ের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও নির্বাচনে পরাজিত হলে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিরোধী নেতাদের তীব্র সমালোচনা করে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তাঁদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে তা আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
রোববার রেডিও নর্থকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের নির্বাচনি সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমাদের জয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তবে আমি আমার জয় নিয়ে নিশ্চিত নই এবং এ নিয়ে আমি খুবই চিন্তিত।’
নির্বাচনে জয়ী হতে না পারলে কিংবা পরবর্তী সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘না, আমি রাজনীতি থেকে অবসর নেব না।’
সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট ও আবিগদোর লিবারম্যানের সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, এই নেতাদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে সেটিকে টিকিয়ে রাখতে আরব দলগুলোর সমর্থন নিতে হবে।
নেতানিয়াহু বলেন, বিরোধী নেতারা নিজেদের নির্বাচনি হিসাব যেভাবেই তুলে ধরুন না কেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে তাঁদের আরব দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, তাদের বাড়িয়ে বলা সংখ্যার হিসাব ধরলেও মনসুর আব্বাস ও আহমেদ তিবিকে ছাড়া গাদি আইজেনকোট কোনো সরকার গঠন করতে পারবেন না। ৬১টি আসন পূর্ণ করতে তাদের এই দুজনেরই সাহায্য লাগবে।’
ভোটারদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আপনারা যদি একটি আত্মসমর্পণকারী ও অকার্যকর সরকার চান, যা ইসরাইলের উত্তর অঞ্চলের শত্রুদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না, তবেই গাদি আইজেনকোটকে ভোট দিন।’
বিরোধীদের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ইসরাইলের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না—এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নিজের নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি।
ইরান ইস্যুতে আইজেনকোটকে নিয়ে প্রশ্ন
সাক্ষাৎকারে ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি মোকাবিলার বিষয়টিও তুলে ধরেন নেতানিয়াহু। তাঁর দাবি, এ ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গাদি আইজেনকোটের অবস্থান যথেষ্ট কঠোর নয়।
নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, আইজেনকোট আগে ‘পারমাণবিক ইরানকে মেনে নিতে হবে’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এ ছাড়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ওপর হামলা চালানোকে ভুল সিদ্ধান্ত বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন বলে দাবি করেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী।
এসব বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নেতানিয়াহু আইজেনকোটের নেতৃত্ব ও নিরাপত্তানীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সামলালেই হবে না, আন্তর্জাতিক পরিসরেও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি তৈরি হলে কোনো আপস না করার মানসিকতাও থাকতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আইজেনকোটের সক্ষমতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, ‘আইজেনকোট কি আমেরিকায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারবেন? তিনি কি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবেন? তিনি কি আদৌ কিছু বোঝেন? ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বমঞ্চে একজন শক্ত ভূমিকা রাখা ব্যক্তিত্ব হতে হবে, যিনি জানেন অস্তিত্বের হুমকির মুখে কোনো আপস চলে না। গাদি বা তার সঙ্গীরা তা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।’
সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানকে নিয়ে অভিযোগ
সাক্ষাৎকারের অন্য এক পর্যায়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের সাবেক প্রধান রোনেন বার প্রসঙ্গে কথা বলেন নেতানিয়াহু। বার তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন—এ প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন এবং সাবেক এই গোয়েন্দাপ্রধানকে ‘মিথ্যাবাদী’ বলে আখ্যা দেন।
নিজের বক্তব্যের পক্ষে নথিপত্র থাকার দাবি করে নেতানিয়াহু জানান, তিনি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের কাছে প্রায় এক হাজার নথি জমা দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এসব নথির কয়েকটি ইন্টারনেটেও পাওয়া যায়, যেখানে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রকের কাছে প্রায় ১,০০০ নথি জমা দিয়েছি, যার বেশ কিছু ইন্টারনেটেও পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে সব স্পষ্ট লেখা রয়েছে। হামলা চালানোর ঠিক দুদিন আগেও এই লোকটি একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল এবং সুবিধার বিনিময়ে সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছিল। তিনি শুরু থেকেই প্রতিটি পদক্ষেপে মিথ্যা বলে আসছেন।’
রোনেন বারের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের মাধ্যমে নেতানিয়াহু নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে সাক্ষাৎকারে সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নেতানিয়াহুর নিজস্ব বক্তব্য।
নির্বাচনের আগে বিরোধী নেতাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক এবং সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানের সঙ্গে আইনি দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যে ইসরাইলের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।
জ/শা