শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটে (এসএলসি) চলমান অস্থিরতা ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা দূর করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির ক্রিকেট বোর্ড। এ লক্ষ্যে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ক্রিকেটের নতুন সংবিধান প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা পার্লামেন্টে অনুমোদনের মাধ্যমে আইনে পরিণত হবে।
এসএলসির রূপান্তর কমিটির প্রধান এরান বিক্রমারত্নে এ তথ্য জানিয়েছেন। আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে শেষ হলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে দেশটির ক্রিকেট বোর্ডে নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সঙ্গে এসএলসির সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথও তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে আইসিসি বোর্ডে এসএলসির ভোটাধিকার স্থগিত রয়েছে। আইসিসির দৃষ্টিতে, দেশটির ক্রিকেট বোর্ডে সরকারি উদ্যোগে রূপান্তর কমিটি গঠন ক্রিকেট প্রশাসনে সরকারি হস্তক্ষেপের শামিল। এই হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে শ্রীলঙ্কা আগামী বছরের নারী চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজনের অধিকারও হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত ‘শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বিল’-এ বিদ্যমান সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। এতে ১৪ সদস্যের একটি বোর্ড গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। বোর্ডের অর্ধেক সদস্য এসএলসির সদস্য সংস্থাগুলোর ভোটে নির্বাচিত হবেন, আর বাকি অর্ধেক স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাবেন। স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে অন্তত দুজন নারী রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
নতুন বিলটির অন্যতম লক্ষ্য হলো শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের প্রশাসনিক কাঠামোকে সরকারের প্রচলিত নিয়ন্ত্রণ থেকে আলাদা করা। বর্তমানে এসএলসি ১৯৭৩ সালের শ্রীলঙ্কা ক্রীড়া আইনের অধীনে পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। প্রস্তাবিত বিলটি আইনে পরিণত হলে এসএলসি ওই আইনের আওতা থেকে বেরিয়ে আসবে এবং ক্রিকেট বোর্ড পরিচালনায় নতুন আইনি কাঠামো কার্যকর হবে।
এরান বিক্রমারত্নে, যিনি গত ১০ বছর দেশটির মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন, বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়া উচিত। তবে তা পার্লামেন্টের কার্যসূচির ওপরও নির্ভর করছে। তার প্রত্যাশা, চলতি বছরের মধ্যেই নতুন সংবিধান শ্রীলঙ্কা ক্রিকেটের জন্য কার্যকর আইনি কাঠামোয় পরিণত হবে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয় এবং এর প্রথম পাঠ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে এটি দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিবেচনায় রয়েছে। গত আট দিনে সাধারণ নাগরিকদের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া বিভিন্ন আবেদনের ওপর শুনানি হয়েছে।
বিক্রমারত্নে জানান, বিলটি উত্থাপনের পর নাগরিকদের দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ ছিল। সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে এবং এ সময়ে বেশ কিছু আবেদন ও পরামর্শ জমা পড়েছে। তার আশা, সুপ্রিম কোর্ট চলতি সপ্তাহেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে। এরপর আগামী সপ্তাহে বিলটি আবার পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো বিল উত্থাপিত হলে সেটি দেশের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিচার বিভাগ কখনো কখনো জানাতে পারে, বিলটি পাস করতে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে বেশি ভোট প্রয়োজন। এমনকি গণভোটের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।
বিলটিতে আরও পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা গ্রহণে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়ে বিক্রমারত্নে বলেন, এই উদ্যোগ কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নেওয়া হয়নি; বরং ক্রিকেট এবং দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা বিবেচনা করেই সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
রূপান্তর কমিটির প্রধানের আশা, বর্তমান সরকারই এই কমিটি গঠন করায় পার্লামেন্টে বিলটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় পাঠের প্রক্রিয়া খুব বেশি জটিল হবে না। বর্তমানে সংসদে সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তার ধারণা, বিলটি উত্থাপনের প্রায় তিন সপ্তাহ পর দ্বিতীয় পাঠ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। এরপর ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিলটি আইনে পরিণত হলেই পুরো সংস্কারপ্রক্রিয়া শেষ হবে না। নতুন কাঠামো কার্যকর করতে আরও কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। কারণ নির্বাচিত কর্মকর্তা এবং নিয়োগপ্রাপ্ত স্বতন্ত্র পরিচালকদের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
বিলটি বর্তমান রূপে পাস হলে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পাবে। একই সঙ্গে বোর্ডের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, পরিচালনা পর্ষদের গঠন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।
জ/উ