বিশ্ব ফুটবলে ব্যক্তিগত অর্জনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি ব্যালন ডি’অর। প্রতিবছর বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের অনেকেই এই পুরস্কার জয়ের স্বপ্ন দেখেন। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো তারকারাও নিজেদের ক্যারিয়ারে পেয়েছেন সোনালি রঙের এই ট্রফি। তবে দেখতে সোনার মতো হলেও এটি পুরোপুরি সোনা দিয়ে তৈরি নয়। ট্রফিটির নির্মাণসামগ্রী, ওজন ও আনুমানিক মূল্য নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল।
ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ প্রতিবছর এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। ইংরেজিতে ‘ব্যালন ডি’অর’ শব্দের অর্থ ‘গোল্ডেন বল’ বা সোনার বল। ট্রফিটির বাইরের অংশে সোনার প্রলেপ থাকলেও এর ভেতরে রয়েছে মোমের মতো একটি উপাদান। মূল কাঠামো তৈরি করা হয় পিতলের পাত দিয়ে, আর নিচের ভিত্তিতে ব্যবহার করা হয় পাইরাইট পাথর।
কী দিয়ে তৈরি ব্যালন ডি’অর ট্রফি?
ব্যালন ডি’অর ট্রফির মূল আকৃতি একটি ফুটবল। এটি তৈরি করতে তামা ও দস্তার সংকর ধাতু পিতলের দুটি পাত ব্যবহার করা হয়। পিতলের চকচকে রং সোনার মতো দেখায়। পাত দুটি ঢালাই করে অর্ধগোলকের আকৃতি দেওয়া হয়, যা জোড়া লাগিয়ে বলের কাঠামো তৈরি করা হয়।
এরপর স্বর্ণকার ব্লোটর্চের সাহায্যে অংশ দুটি জোড়া দেন। অন্যদিকে, খোদাইশিল্পী বলটির ভেতরে মোমের মতো উপাদান দিয়ে পূর্ণ করেন। ছেনি ও হাতুড়ি ব্যবহার করে ফুটবলের সেলাইয়ের নকশাও ফুটিয়ে তোলা হয়।
মূল কাঠামো তৈরি হয়ে গেলে ট্রফিটির বাইরের অংশে খাঁটি সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়। এর গায়ে আগে থেকেই ‘ফ্রান্স ফুটবল’-এর লোগো খোদাই করা থাকে। সবশেষে ট্রফিটি পাইরাইট পাথরযুক্ত একটি ভিত্তির ওপর বসানো হয়।
ট্রফিটির বাইরের অংশে ১৮ ক্যারেট সোনার প্রলেপ দেওয়া হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে এতে ঠিক কতটা সোনা ব্যবহার করা হয়, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে অসংগতি রয়েছে।
ব্যালন ডি’অরের দাম কত?
ব্যালন ডি’অর ট্রফির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ইউরো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় চার লাখ টাকা। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও বিরলতার কারণে ট্রফিটির মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে এর সম্ভাব্য মূল্য ৫ লাখ ইউরো ছাড়িয়ে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে ট্রফি তৈরির উপকরণের আনুমানিক মূল্য এবং এর ঐতিহাসিক বা সংগ্রহযোগ্য মূল্য এক বিষয় নয়। ফলে এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে শুধু ব্যবহৃত সোনার পরিমাণ বিবেচনা করলেই চলে না।
উচ্চতা ও ওজন কত?
ব্যালন ডি’অর ট্রফির উচ্চতা প্রায় ৩১ সেন্টিমিটার। এর দৈর্ঘ্য ২৩ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থও ২৩ সেন্টিমিটার। ওজন প্রায় ৭ কেজি ২০০ গ্রাম।
আকারে খুব বড় না হলেও ওজনের কারণে ট্রফিটি হাতে নিয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা সহজ নয়। এর গোলাকার ফুটবল আকৃতি ও সোনালি চাকচিক্য একে অন্যান্য ক্রীড়া পুরস্কার থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
১৯৫৬ সালে প্রথম দেওয়া হয় পুরস্কার
১৯৫৬ সালে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রথম ট্রফিটি তৈরি করেছিল ফরাসি অলংকার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেলেরিও দি মেলেরো। বর্তমান ট্রফির নকশাকার হিসেবে ফ্রাঁসোয়া মেলেরিওর নাম উল্লেখ করা হয়।
১৯৮৩ সাল থেকে ট্রফিটির বর্তমান নকশা ব্যবহার করা হচ্ছে। আগের সংস্করণটির আকৃতিও অনেকটা একই রকম ছিল, তবে সেটি আকারে ছোট এবং চাকচিক্যে তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো নারীদের ব্যালন ডি’অর চালু করা হয়। এই পুরস্কারের নাম ‘ব্যালন ডি’অর ফেমিনাঁ’। চালুর পর থেকে নারীদের পুরস্কারের ট্রফির নকশা একই রয়েছে।
ট্রফি জিতলে কি অর্থ পুরস্কার মেলে?
ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য ফ্রান্স ফুটবল সরাসরি কোনো অর্থ পুরস্কার দেয় না। তবে খেলোয়াড়দের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিজ নিজ ক্লাব বা স্পনসরদের কাছ থেকে আর্থিক বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
আরেকটি বিষয় হলো, বিজয়ীরা সাধারণত মূল ট্রফির পরিবর্তে এর একটি প্রতিরূপ পেয়ে থাকেন। সেই ট্রফি অনেক সময় খেলোয়াড়দের ক্লাবে রাখা হয় অথবা জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়।
সব মিলিয়ে, ব্যালন ডি’অরের গুরুত্ব শুধু এর সোনালি রং বা আর্থিক মূল্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবলে অসাধারণ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার বিশ্বজুড়ে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
জ/শা