দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থাপিত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট। এসব ব্যবস্থায় নেট মিটারিং চালু হলে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরতা আরও কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর নেট মিটারিং অনুমোদনের প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত দেশের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৬৩ কিলোওয়াট। অন্যদিকে, পাঁচটি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে স্থাপিত ব্যবস্থার সক্ষমতা ৪০৫ দশমিক ৫ কিলোওয়াট। সব মিলিয়ে মোট সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬৮ দশমিক ৫ কিলোওয়াট বা প্রায় ৫ দশমিক ০৭ মেগাওয়াট। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারি অর্থায়নে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৫ কোটি ১৪ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি কার্যালয়ের ভবনগুলোতে ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও চালু করা হয়েছে। তবে নেট মিটারিংয়ের অনুমোদনসহ কয়েকটি প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলে সৌরবিদ্যুতের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ বিল কমানোর সুযোগ বাড়বে। দিনের বেলায় কার্যালয়ের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা গেলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার পরিমাণও কমতে পারে।
বিভাগ ও জেলাভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা
ঢাকা বিভাগ: এ বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে কিশোরগঞ্জে সর্বোচ্চ ৩৬০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে ৭৭, গোপালগঞ্জে ৭৩, ফরিদপুরে ৫৯, ঢাকা ও রাজবাড়ীতে ৫০ করে, শরীয়তপুরে ২৪ এবং গাজীপুরে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগের জেলাগুলোতে প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা। তবে টাঙ্গাইল, মাদারীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে দরপত্র আহ্বান করা হলেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
খুলনা বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে খুলনায় ১৮০, মেহেরপুরে ৮০, ঝিনাইদহ ও নড়াইলে ৬০ করে এবং বাগেরহাটে ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৭৪ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৭৮ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। তবে চুয়াডাঙ্গায় বরাদ্দের তুলনায় দরপত্রে প্রস্তাবিত মূল্য বেশি হওয়ায় কাজ এগোয়নি।
রংপুর বিভাগ: এ বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে দিনাজপুরে ১৫১, গাইবান্ধায় ১২২, ঠাকুরগাঁওয়ে ৫০, নীলফামারীতে ৪৮, কুড়িগ্রামে ৪৫, রংপুরে ২৯, পঞ্চগড়ে ২৫ এবং লালমনিরহাটে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এ বিভাগে জেলা পর্যায়ে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮ লাখ ৫২ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭৭ দশমিক ৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকা।
রাজশাহী বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জে ১৫০, নওগাঁয় ১০৫, বগুড়ায় ১০০, রাজশাহীতে ৫০, পাবনায় ৪৭ দশমিক ২৬, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩০ করে এবং জয়পুরহাটে ১৩ দশমিক ১২৫ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে জেলা পর্যায়ে মোট ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৪৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৩৮ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ১৮ লাখ ২১ হাজার টাকা।
সিলেট বিভাগ: এ বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে মৌলভীবাজারে ১৮০, সিলেটে ১০০, সুনামগঞ্জে ৯০ এবং হবিগঞ্জে ১০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ ৮ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ৭০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
চট্টগ্রাম বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে নোয়াখালীতে ২২৫, কক্সবাজারে ৮৫, চাঁদপুরে ৫০, ফেনীতে ৪৫, বান্দরবানে ৪১ এবং চট্টগ্রাম জেলায় ৩৯ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে জেলা পর্যায়ে মোট ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৮ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতা ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
বরিশাল বিভাগ: এ বিভাগের জেলা কার্যালয়গুলোর মধ্যে বরগুনায় ৬০ এবং পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে ৫০ কিলোওয়াট করে সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। এ বিভাগে মোট ব্যয় হয়েছে ৪১ লাখ ২১ হাজার টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ২০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপনে ব্যয় হয়েছে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তবে ঝালকাঠিতে বরাদ্দ থাকলেও অর্থ ব্যয় করা হয়নি। বরিশাল ও ভোলা জেলার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতার তথ্য পাওয়া যায়নি।
ময়মনসিংহ বিভাগ: এ বিভাগের জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর মধ্যে জামালপুর ও নেত্রকোনায় ১০০ কিলোওয়াট করে, শেরপুরে ৬০ এবং ময়মনসিংহ জেলায় ৫০ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ বিভাগের প্রকল্প ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায়নি। ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ভাড়া ভবনে পরিচালিত হওয়ায় সেখানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুর ও রাঙামাটি জেলায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সক্ষমতার তথ্য পাওয়া যায়নি।
নেট মিটারিং চালু হলে বাড়বে সাশ্রয়ের সুযোগ
সরকার নিজস্ব অর্থায়নে মূলধনি ব্যয়ভিত্তিক বা ‘ক্যাপেক্স মডেল’-এ এসব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। এর ফলে সরকারি কার্যালয়গুলো দিনের বেলায় নিজেদের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করতে পারছে। এতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। নেট মিটারিং চালু হলে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে বিল সমন্বয়ের সুযোগও রয়েছে। তবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়গুলোর নেট মিটারিংয়ের আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) শরীয়তপুর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ২৪ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু নেট মিটারিংয়ের আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকায় উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয় এখনো শুরু হয়নি।
ওজোপাডিকো জানায়, শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতি মাসে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫ হাজার ইউনিট। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর প্রতি মাসে প্রায় ৮০০ ইউনিট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এতে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার প্রয়োজন কমছে এবং কার্যালয়টির বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে।
সরকারি-বেসরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরামর্শ
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের ছাদে স্থাপিত ৫ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা জাতীয় পর্যায়ে খুব বড় অবদান না রাখলেও এগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে অন্য সরকারি ও বেসরকারি ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ পর্যায়েও আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে নেট মিটারিং সংযোগ দিতে দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন এবং নেট মিটারিং সংযোগের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
মেহেরপুরের জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায় বলেন, সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগের আওতায় মেহেরপুরে ইতোমধ্যে ৮০ কিলোওয়াট সক্ষমতার ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো গেলে জাতীয় গ্রিডের ওপর বিদ্যুতের চাহিদাজনিত চাপ কমাতে সহায়তা করবে। বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ১০ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট
বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ গ্রহণ করা হয়েছে। এ কৌশলপত্রে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট আসার কথা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ১ হাজার ৯৩৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৬৪২ মেগাওয়াট, যা নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মোট উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ।
জ/উ