মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া নিকাহনামায় ‘বিলম্বিত দেনমোহর’ নির্ধারণের সুযোগ নেই বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, স্ত্রী দেনমোহর দাবি করলে তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে। স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধ না করায় স্ত্রীকে আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা হলে পারিবারিক আদালত বিবেচনাধিকার প্রয়োগ করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারবেন।
‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত সেপ্টেম্বর মাসে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে রায়টি প্রকাশ করা হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর ২২ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে সানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। পরে যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক মনোমালিন্যের জেরে ২০১৭ সালে স্ত্রীকে তালাক দেন ইয়াকুব। তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ এবং কন্যাসন্তানের ভরণপোষণ চেয়ে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন সানজিদা।
২০২২ সালের ২৫ মে পারিবারিক আদালত স্ত্রীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন। রায়ে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং কন্যাসন্তানের ভরণপোষণ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা দুই মাসের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কন্যাসন্তানের বিয়ের আগ পর্যন্ত প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা করে ভরণপোষণ দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়, যার পরিমাণ প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে বাড়বে।
পারিবারিক আদালতের একতরফা রায়ের বিরুদ্ধে পরের বছর আপিল করেন ইয়াকুব। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা জজ তাঁর আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন তিনি।
হাইকোর্টে শুনানিতে ইয়াকুবের আইনজীবী দাবি করেন, ডিক্রিতে নির্ধারিত অর্থের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে বাকি অর্থ এককালীন পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই মানবিক বিবেচনায় বকেয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণের অর্থ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানান তিনি।
অন্যদিকে, স্ত্রীর পক্ষে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, স্বামী আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী ও কন্যাসন্তানকে তাঁদের আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন। তথ্যপ্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতেই পারিবারিক আদালত যুক্তিসংগত রায় দিয়েছেন। তাই রিভিশন আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ক্ষেত্রে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেন, দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ বা ক্ষমা করার এখতিয়ার আদালতের নেই। তবে স্ত্রী স্বেচ্ছায় চাইলে স্বামীর অনুকূলে দেনমোহরের সম্পূর্ণ অর্থ বা আংশিক অর্থ মওকুফ করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী সচেতনভাবে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ।
আদালত আরও বলেন, বলপ্রয়োগ, অনুচিত প্রভাব, প্রবঞ্চনা কিংবা স্ত্রীর স্বাধীন সম্মতিকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো উপায়ে আদায় করা তথাকথিত মওকুফকে বৈধ বলে গণ্য করার সুযোগ নেই।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, আলোচ্য মামলায় নির্ধারিত দেনমোহর বর ও কনের আর্থিক সামর্থ্য কিংবা সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায় নির্ধারণ করা হয়নি। তবে লিখিত দেওয়ানি চুক্তির শর্তাবলি উপেক্ষা করার সুযোগ কারও নেই। বর্তমান সামাজিক বাস্তবতায় স্কুলগামী নাবালিকা সন্তানের জন্য নির্ধারিত ভরণপোষণের পরিমাণও যথাযথ বলে মনে করেন আদালত। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হাইকোর্ট রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল রাখেন।
জ/উ