সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসা, দ্বিগুণ শাস্তির প্রস্তাব

জবাবদিহি ডেস্ক

জাতীয়

2026-10-21T12:52:59+06:00
2026-10-21T13:01:28+06:00
বুধবার ● ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
জাতীয়
সড়ক নিরাপত্তা আইনের খসড়ায় বিনামূল্যে চিকিৎসা, দ্বিগুণ শাস্তির প্রস্তাব
জবাবদিহি ডেস্ক
⏲ ১২:৫২ পিএম | ২১ অক্টোবর, ২০২৬ | বুধবার
ছবি- এআই নির্মিত
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সংকটময় মুহূর্তে বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা, দুর্ঘটনায় সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সে ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ এবং একই অপরাধ বারবার করলে দ্বিগুণ শাস্তির বিধান রেখে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (আরটিএইচডি) প্রণীত প্রস্তাবিত আইনটির লক্ষ্য সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো গড়ে তোলা। খসড়া আইনটিতে ১৫টি অধ্যায়, ১১১টি ধারা ও দুটি তফসিল রয়েছে।

‘জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সংস্থাপন শাখার উপসচিব আল-আমীন মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আইনের খসড়াটি চূড়ান্ত করেছি, যা শিগগিরই মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।’

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৩১ হাজার ৫৭৮ জন প্রাণ হারান। তবে বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৪৯০ জন। সংস্থাটির এ হিসাব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমানের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ কম।

প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় সড়ক দুর্ঘটনাকে ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাব উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছিল বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলনে এ অঙ্গীকার করা হয়।

চলতি বছরের ২০ ও ২১ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সেই অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। এর ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা ও বিভিন্ন দেশের আইন পর্যালোচনা করে খসড়া প্রণয়নের জন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ একটি কমিটি গঠন করে।

গত ১৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আবারও জানান, ২০২৭ সালের মধ্যে আইনটি চূড়ান্তভাবে প্রণয়নের লক্ষ্যে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। এ ছাড়া চলতি বছরের মধ্যে গতি ব্যবস্থাপনা ম্যানুয়াল ও হেলমেট ব্যবহারের নির্দেশিকা তৈরির পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে সরকার।

সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব
প্রস্তাবিত খসড়ায় সড়ক নেটওয়ার্ক ও মোড়গুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নকশা করা, পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ ‘ব্ল্যাক স্পট’ নিয়মিত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পথচারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত ফুটপাত, র‌্যাম্প বা লিফটসহ ফুটওভার ব্রিজ এবং নিরাপদ রিফিউজ আইল্যান্ড নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি নারী, অন্তঃসত্ত্বা, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গণপরিবহনে ওঠানামা ও চলাচল সহজ করতে পরিবহন পরিচালনাকারীদের জন্য বাধ্যবাধকতা রাখার কথা বলা হয়েছে।

গতি নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে গতি পরিমাপক ক্যামেরা, স্পিড হাম্প, রাম্বল স্ট্রিপ এবং ‘ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম’ (আইটিএস) স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘স্টার-রেটিং সিস্টেম’ অনুসরণ, সড়কের পরিকল্পনা ও নকশা থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত নিরাপত্তা অডিট এবং নিয়মিত পরিদর্শনের বিধান রাখা হয়েছে।

চালক ও যাত্রীদের জন্য যেসব নিয়ম
খসড়া আইন অনুযায়ী, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন বা একই ধরনের ডিভাইস ব্যবহার, ধূমপান, খাবার খাওয়া কিংবা উচ্চ শব্দে গান শোনা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। চালকের মনোযোগ বিঘ্নিত করতে পারে—যাত্রীদের এমন আচরণও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।

চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্য সিটবেল্ট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। ১৪ বছরের কম বয়সী অথবা ১৩৫ সেন্টিমিটারের কম উচ্চতার শিশুদের সামনের আসনে বসানো নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের জন্য উপযুক্ত সুরক্ষামূলক ‘রেস্ট্রেইন্ট সিস্টেম’ ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে।

মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রয়োজনে পুলিশ ও অনুমোদিত কর্মকর্তারা চালকের শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করার জন্য ব্রেথঅ্যালাইজার ব্যবহার করতে পারবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষাগারেও পরীক্ষা করার বিধান রাখা হয়েছে।

মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী উভয়ের জন্য বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) অনুমোদিত মানসম্মত হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের মোটরসাইকেলের যাত্রী হিসেবে বহন নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।

রাস্তার অবস্থা অনুকূল হলে সাইকেলের জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ এবং সাইকেল চালকদের হেলমেটসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম ব্যবহারের বাধ্যবাধকতাও খসড়ায় রয়েছে। অন্যদিকে, পথচারীদের ফুটপাত ব্যবহার এবং জেব্রা ক্রসিং ও রিফিউজ আইল্যান্ডসহ নির্ধারিত স্থান দিয়ে রাস্তা পারাপার হতে হবে।

ডিমেরিট পয়েন্ট ও দ্বিগুণ শাস্তির বিধান
প্রস্তাবিত ‘ডিমেরিট পয়েন্ট’ ব্যবস্থায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পয়েন্ট কাটা যাবে। নির্দিষ্ট সীমায় পয়েন্ট পৌঁছালে বা জমা হলে লাইসেন্স বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বা পরবর্তী সময়ে একই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ নির্ধারিত শাস্তি বা জরিমানা দ্বিগুণ করার প্রস্তাব রয়েছে খসড়ায়।

প্রস্তাবিত আইনের ৭৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো পথচারী ফুটপাত ব্যবহার না করলে প্রথমবারের অপরাধে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।

দুর্ঘটনায় আহতদের বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, সড়ক দুর্ঘটনার পর সংকটময় সময় বা ‘গোল্ডেন আওয়ারে’ আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

খসড়ায় বলা হয়েছে, অগ্রিম টাকা বা টিকিট ছাড়াই হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তাৎক্ষণিক জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার কঠোর ও বাধ্যতামূলক বিধান না থাকা বিদ্যমান আইনি কাঠামোর একটি বড় ঘাটতি। এ কারণে নতুন আইনে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জন্য সংকটময় মুহূর্তে বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। এর ফলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের জীবন রক্ষার সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

দুর্ঘটনায় সাহায্যকারীদের আইনি সুরক্ষা
পুলিশি হয়রানি, ফৌজদারি মামলা ও আদালতে পাঠানোর আশঙ্কায় অনেক সময় সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের উদ্ধারে এগিয়ে আসতে দ্বিধা করেন। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে খসড়া আইনে স্বেচ্ছাসেবী ও উদ্ধারকারীদের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা থেকে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

আইনি জটিলতার আশঙ্কা দূর করে সাধারণ মানুষকে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের সহায়তায় উৎসাহিত করা এবং দ্রুত উদ্ধারকাজ নিশ্চিত করাই এ বিধানের উদ্দেশ্য।

দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেস
আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রকাশ ও সংরক্ষণের জন্য একটি ‘সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডাটাবেস সিস্টেম’ গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। এ ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করবে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা জোরদার, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি উন্নত করা এবং সড়ক নিরাপত্তার বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নের জন্য আলাদা ‘গবেষণা তহবিল’ গঠনের কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া চালকদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা তদন্ত, দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা ব্যয় এবং যাত্রীবিমার মতো বিষয় খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আইনের দুটি তফসিলে দুর্ঘটনা-পরবর্তী সেবা প্রদান এবং অ্যালকোহল বা অন্য কোনো মাদকদ্রব্য সেবন করে যানবাহন চালানোসংক্রান্ত বিধিবিধান রাখা হয়েছে।

পৃথক আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-এ আরও সংশোধনী আনলেও সড়ক প্রকৌশল, যানবাহনের মান নির্ধারণ, গতি ব্যবস্থাপনা, পথচারীদের সুরক্ষা, জরুরি চিকিৎসাসেবা, গবেষণা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্তভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়।

এ কারণে বৈশ্বিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইন প্রণয়ন ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ সড়ক দুর্ঘটনার পরবর্তী ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জোরদারের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জ/উ


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত