ফিচার ডেস্ক

ফিচার

2026-08-26T12:31:13+06:00
2026-08-26T12:31:13+06:00
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
ফিচার
খাবারের টেবিলে এখনও গোপাল ভাঁড়ের রাজত্ব
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩১ পিএম 
দুপুর কিংবা রাতের খাবারের সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছেন-চেনা এই দৃশ্যের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নতুন এক অভ্যাস। ভাত, তরকারি, ডাল কিংবা মাছের পাশাপাশি অনেকের খাবারের টেবিলে জায়গা করে নিয়েছে মোবাইল ফোন। ফোনে ইউটিউব খুলে ‘গোপাল ভাঁড়’-এর একটি পর্ব চালিয়ে না দিলে যেন অনেকের খাওয়াই জমে না।

শুধু শিশু-কিশোর নয়, বড়দের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে একই প্রবণতা। দুপুরের খাবার হোক কিংবা রাতের, প্লেট সামনে আসার পরপরই অনেকের হাতে চলে যাচ্ছে ফোন। পর্দায় শুরু হচ্ছে গোপালের বুদ্ধির খেলা, হাস্যরস আর নানা কাণ্ডকারখানা।

বিষয়টি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবের কমেন্ট বক্সেও চোখে পড়ছে। বিভিন্ন ভিডিওর নিচে বাংলা ভাষাভাষী দর্শকদের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও প্রবাসী অনেক বাঙালি খাওয়ার সময় গোপাল ভাঁড়ের কার্টুন দেখেন। কেউ দুপুরের খাবারের সঙ্গে, কেউ আবার রাতের খাবারের সময় গোপালের গল্পকে সঙ্গী করছেন। অর্থাৎ, অনেকের কাছে এটি এখন নিছক কার্টুন দেখার বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের খাওয়ার রুটিনেরই একটি অংশ হয়ে উঠেছে।

হঠাৎ কেন এত জনপ্রিয় গোপাল?
‘হঠাৎ’ শব্দটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গোপাল ভাঁড় বাঙালির কাছে কোনো নতুন চরিত্র নয়। বহু বছর ধরে লোককথা, বই, পত্রিকা, নাটক ও নানা মাধ্যমে এই চরিত্রের গল্প পরিচিত। তবে অ্যানিমেশন সিরিজ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পুরোনো এই চরিত্র নতুন প্রজন্মের কাছে যে পরিসরে পৌঁছেছে, আগের মাধ্যমগুলোতে তা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে বিনোদনের জন্য টেলিভিশনের নির্দিষ্ট সম্প্রচারের সময়ের অপেক্ষায় থাকতে হয় না। ইউটিউবে নিজের সুবিধামতো যেকোনো সময় একটি পর্ব চালানো যায়। খাবার সামনে রেখে মোবাইলে কয়েকটি ক্লিকেই পাওয়া যাচ্ছে গোপাল ভাঁড়ের একের পর এক গল্প। একটি পর্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সামনে আসছে একই ধরনের আরও ভিডিও। এভাবেই খাবারের সময়ের কয়েক মিনিটের বিনোদন ধীরে ধীরে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে।

এর সঙ্গে গোপাল ভাঁড়ের গল্পের ধরনও মানিয়ে যায়। বেশির ভাগ গল্পেই রয়েছে হাস্যরস, বুদ্ধির খেলা, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে গোপালের কথোপকথন এবং শেষ মুহূর্তে গোপালের চমকপ্রদ সমাধান। গল্পগুলো সহজে বোঝা যায় এবং একটি পর্ব দেখতে দীর্ঘ সময় কিংবা অতিরিক্ত মনোযোগের প্রয়োজন হয় না। ফলে খাবারের সঙ্গে হালকা বিনোদনের জন্য এটি অনেকের কাছে উপযোগী হয়ে উঠেছে।

গোপাল ভাঁড় আসলে কে?
গোপাল ভাঁড়ের শিকড় বাংলার লোককথায়। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, তিনি ছিলেন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারের রসিক ও বুদ্ধিমান সভাসদ। তাঁর উপস্থিত বুদ্ধি, তীক্ষ্ণ রসবোধ ও নানা কৌতুকের গল্প দীর্ঘদিন ধরে বাংলায় মুখে মুখে প্রচলিত। প্রচলিত বর্ণনায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দরবারে গোপালের বিশেষ মর্যাদা ছিল। কোথাও কোথাও তাঁকে নবরত্নদের একজন হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

তবে ঐতিহাসিকভাবে গোপাল ভাঁড় ঠিক কতটা বাস্তব চরিত্র ছিলেন, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাঁর জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যও সীমিত। গবেষণা ও লোকসাহিত্যে তাঁর পরিচয় কিংবদন্তি এবং প্রচলিত কাহিনির সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে বর্তমানের গোপাল ভাঁড় একদিকে লোকসংস্কৃতির পরিচিত চরিত্র, অন্যদিকে বাঙালির দীর্ঘ হাস্যরসের ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লোককথা থেকে অ্যানিমেশনের পর্দায়
গোপাল ভাঁড়ের গল্প বহু বছর ধরেই বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে আছে। তবে অ্যানিমেশন সিরিজের মাধ্যমে চরিত্রটি শিশুদের কাছে নতুন রূপে পরিচিত হয়। ভারতের টেলিভিশন চ্যানেল সনি আট-এ ‘গোপাল ভাঁড়’ অ্যানিমেশন সিরিজের যাত্রা শুরু হয় ২০১৫ সালে। পরে টেলিভিশনের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সিরিজটির বিভিন্ন পর্ব ছড়িয়ে পড়ে।

সিরিজের গল্পে সেই পরিচিত গোপালই কেন্দ্রীয় চরিত্র-যিনি নিজের বুদ্ধি ও রসবোধ দিয়ে রাজদরবারের নানা সমস্যার সমাধান করেন। ফলে একই চরিত্রকে ভিন্ন দুই প্রজন্ম নতুনভাবে চিনতে শুরু করে। বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদির কাছে গোপাল ভাঁড় ছোটবেলার গল্পের চরিত্র হলেও শিশুদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন রঙিন অ্যানিমেশনের হাস্যরসাত্মক এক চরিত্র।

শুধু শিশুদের কার্টুন নয়
গোপাল ভাঁড়ের জনপ্রিয়তার বড় কারণ, এটি শুধু শিশুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুরা গোপালের মজার কাণ্ড দেখে আনন্দ পায়, আবার বড়রা গল্পের ব্যঙ্গ, বুদ্ধির খেলা কিংবা পুরোনো বাংলার আবহ উপভোগ করেন। ফলে একই কনটেন্ট পরিবারের বিভিন্ন বয়সী সদস্য একসঙ্গে দেখতে পারেন।

২০২৬ সালেও গোপাল ভাঁড়কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনা ও ভাইরাল কনটেন্ট তৈরি হয়েছে। কার্টুনটি শেষ হয়ে যাচ্ছে-এমন একটি গুজব নিয়েও আলোচনা হয়। পরে দেখা যায়, পুরোনো একটি পর্বের দৃশ্যকে কেন্দ্র করে ওই দাবি তৈরি হয়েছিল, যা বিভ্রান্তিকর। একই সময়ে নতুন পর্ব সম্প্রচারের তথ্যও সামনে আসে। এসব আলোচনা আবারও দর্শকদের মধ্যে চরিত্রটির প্রতি আগ্রহের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে।

খাবারের সঙ্গে গল্প, সঙ্গী এখন মোবাইল
খেতে বসে গোপাল ভাঁড় দেখা আসলে একদিনে তৈরি হওয়া কোনো অভ্যাস নয়। পুরোনো লোককথার পরিচিত চরিত্র, সহজ-সরল হাসির গল্প, অ্যানিমেশনের আকর্ষণ এবং ইউটিউবের সহজলভ্যতা-সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই প্রবণতা।

বাঙালির খাবারের সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক বহু পুরোনো। সময় বদলেছে, বদলেছে গল্প শোনার মাধ্যমও। একসময় খাবারের টেবিলে গল্প শোনাতেন পরিবারের মানুষ; এখন সেই জায়গার একটি অংশ নিয়েছে মোবাইলের পর্দা। আর সেই পর্দায় হাসতে হাসতে ভাত খাওয়ার সঙ্গী হয়ে উঠেছেন গোপাল ভাঁড়।

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]