রাতে ঘুমানোর সময় হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পর শ্বাস শুরু হচ্ছে। অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই বিষয়টি বুঝতে পারেন না। এ সময় নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শরীরে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। তখন ব্রেন আপনাকে জোর করে সামান্য জাগিয়ে তোলে, যাতে আপনি আবার নিঃশ্বাস নিতে পারেন। এই সমস্যার নাম স্লিপ অ্যাপনিয়া।
এ প্রক্রিয়ায় আমরা হয়তো পুরোপুরি জেগে উঠি না, কিন্তু আমাদের গভীর ও স্বাস্থ্যকর ঘুমের চক্র বারবার ভেঙে যায়। ফলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম হয় না এবং দীর্ঘ মেয়াদে শরীরে দেখা দেয় নানারকম জটিলতা।
স্লিপ অ্যাপনিয়া কী এবং কেন হয়?
সহজভাবে বললে, ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস বাধাগ্রস্ত হওয়াকেই স্লিপ অ্যাপনিয়া বলে।
স্লিপ অ্যাপনিয়া সাধারণত তিন ধরনের হয়। প্রথমটি হলো অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ওএসএ। এ সমস্যায় ঘুমানো অবস্থায় গলার ভেতরের পেশিগুলো ঢিলে হয়ে যায়। ফলে আশপাশের টিস্যুগুলো শ্বাসনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং বাতাস চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
দ্বিতীয়টি সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া বা সিএসএ। এ সমস্যায় আপনার ব্রেন ঘুমানোর সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে জড়িত পেশিগুলো কাজ করার জন্য কোনো সংকেত পাঠায় না।
তৃতীয়টি হলো মিক্সড বা কমপ্লেক্স স্লিপ অ্যাপনিয়া। এটি প্রথম দুটি ধরনের একটি মিশ্র রূপ।
কীভাবে বুঝবেন
স্লিপ অ্যাপনিয়ার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো নাক ডাকা। তবে শুধু নাক ডাকলেই যে স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, এমন নয়। ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠা, কিছুক্ষণ শ্বাস বন্ধ থাকা এবং পরে আবার জোরে শ্বাস নেওয়া এর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
অনেকের ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসা বা শ্বাস নিতে না পারার মতো অনুভূতি হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরও শরীর ক্লান্ত লাগে। সকালে মাথাব্যথা, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, অস্থির ঘুম, মন খারাপ, উদ্বেগ এবং যৌন সমস্যাও দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে লক্ষণ কিছুটা আলাদা হতে পারে।
ঝুঁকি কতটা
যে কেউ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। তবে যাদের পরিবারে এ রোগের ইতিহাস আছে, যারা স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনে ভুগছেন, যাদের টনসিল বড়, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের সমস্যা আছে, তাদের ঝুঁকি বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকিও বাড়তে থাকে। ৫০ বছরের আগে পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
চিকিৎসা না করলে এ থেকে হৃদরোগ উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক এমনকি হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মৃত্যুও ঘটতে পারে
চিকিৎসা না করলে স্লিপ অ্যাপনিয়া থেকে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক এমনকি হঠাৎ হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মৃত্যুও ঘটতে পারে। দিনের বেলা হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়ার (মাইক্রোস্লিপ) কারণে গাড়ি চালানো বা ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়?
চিকিৎসক প্রথমে রোগীর লক্ষণ, ঘুমের ধরন এবং শারীরিক ও পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চান। এরপর প্রয়োজন হলে ঘুমের পরীক্ষা করা হয়। সবচেয়ে পরিচিত পরীক্ষার নাম পলিসমনোগ্রাম। এটি সাধারণত রাতে করা হয়। ঘুমের সময় হৃৎস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, মস্তিষ্কের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় এতে দেখা হয়। কিছু ক্ষেত্রে বাড়িতেও ঘুমের পরীক্ষা করা যায়। পাশে ঘুমানো ব্যক্তি যদি ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়ার বিষয়টি লক্ষ করেন, সেটিও চিকিৎসকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ঘুমের সময়ের অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিংও রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হতে পারে।
রোগ কতটা গুরুতর, তা বোঝার উপায়
স্লিপ অ্যাপনিয়ার মাত্রা বোঝার জন্য চিকিৎসকরা এএইচআই বা অ্যাপনিয়া হাইপোপনিয়া ইনডেক্স ব্যবহার করেন। প্রতি ঘণ্টায় গড়ে কতবার শ্বাস বন্ধ হচ্ছে বা শ্বাসের প্রবাহ কমে যাচ্ছে, সেটিই এতে হিসাব করা হয়।
প্রতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ১৪ বার হলে তা হালকা স্লিপ অ্যাপনিয়া, ১৫ থেকে ২৯ বার হলে মাঝারি এবং ৩০ বার বা তার বেশি হলে গুরুতর স্লিপ অ্যাপনিয়া হিসেবে ধরা হয়।
চিকিৎসা কী?
চিকিৎসা নির্ভর করে স্লিপ অ্যাপনিয়ার ধরন ও মাত্রার ওপর। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সিপ্যাপ নামে একটি শ্বাস নেওয়ার যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এটি ঘুমের সময় শ্বাসনালি খোলা রাখতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুমের অবস্থান পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন। চিৎ হয়ে না শুয়ে অন্যভাবে ঘুমালে কিছু মানুষের শ্বাসনালিতে চাপ কমতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে মুখে পরার বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা শ্বাসনালি খোলা রাখতে সাহায্য করে। কিছু রোগীর জন্য বিশেষ বৈদ্যুতিক উদ্দীপনার যন্ত্র, ওষুধ বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
সব স্লিপ অ্যাপনিয়া কি ভালো হয়?
সব ধরনের স্লিপ অ্যাপনিয়ার জন্য এক ধরনের চিকিৎসা বা স্থায়ী সমাধান নেই। তবে অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার কিছু ক্ষেত্রে ওজন কমানো বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরোপুরি ভালো হতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে একাধিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজন হয়।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
ঝুঁকি কমানোর জন্য স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা উপকারী।
নিয়মিত সময়ে ঘুমানো, ঘুমের আগে ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ব্যবহার কমানো এবং ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের মতো সমস্যা থাকলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় থেকে বিরত থাকাও ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকের দেওয়া চিকিৎসা পরিকল্পনা নিয়মিত মেনে চলা। কোনো যন্ত্র ব্যবহার করতে সমস্যা হলে বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে চিকিৎসককে জানানো উচিত।
বুকে চাপ বা ব্যথা, ঠান্ডা ঘাম, শ্বাসকষ্ট, শরীরের এক পাশে হঠাৎ দুর্বলতা বা অবশ হয়ে যাওয়া, কথা বলতে বা হাঁটতে সমস্যা, দৃষ্টির পরিবর্তন কিংবা তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল