ফিচার ডেস্ক

ফিচার

2026-08-15T14:20:12+06:00
2026-08-15T14:20:12+06:00
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
ফিচার
অষ্টম শতাব্দী পরও ইতিহাসের পাতায় অমর নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬, ২:২০ পিএম 
বিশ্বের প্রাচীনতম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম ভারতের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। বিহারে গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমলে ৪২৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাকেন্দ্র একসময় এশিয়ার জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও বৌদ্ধধর্মসহ নানা বিষয়ে এখানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল। চীন, তিব্বত ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা নালন্দায় পড়তে আসতেন।

প্রায় আট শতাব্দী আগে ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই জ্ঞানকেন্দ্র দীর্ঘ বিরতির পর আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আবারও যাত্রা শুরু করেছে। ২০১৪ সালে অস্থায়ী অবস্থান থেকে নতুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।

বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়
খ্রিস্টীয় ৪২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত নালন্দাকে বিশ্বের প্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক সময়ের নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তুলনা করে অনেকেই প্রাচীন ভারতের ‘আইভি লিগ’ হিসেবে নালন্দাকে উল্লেখ করেন।

পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য আসতেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, দর্শন ও বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানচর্চা হতো। সেই সময়ের খ্যাতিমান পণ্ডিতদের অনেকেই এখানে শিক্ষকতা করতেন।

দালাই লামা একবার বলেছিলেন, ‘বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে আজ আমাদের কাছে যে জ্ঞান রয়েছে, তার উৎস নালন্দা।’

কঠিন ছিল ভর্তি প্রক্রিয়া
নালন্দায় ভর্তি হওয়া সহজ ছিল না। আগ্রহী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পণ্ডিতদের সামনে কঠিন মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হতো। পরীক্ষায় উত্তীর্ণরাই সেখানে শিক্ষার সুযোগ পেতেন।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পণ্ডিতেরা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতেন। ধর্মপাল ও শীলভদ্রের মতো বৌদ্ধ গুরুদের নেতৃত্বে নালন্দায় গড়ে উঠেছিল একটি সমৃদ্ধ জ্ঞানসমাজ।

ছিল জ্ঞানচর্চার উদার পরিবেশ
সাত শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নালন্দা এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্যতম বোলোনিয়া কিংবা অক্সফোর্ড প্রতিষ্ঠার কয়েক শতাব্দী আগেই এখানে উচ্চশিক্ষার একটি বিস্তৃত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

নালন্দার যাত্রা শুরু হয়েছিল গুপ্ত সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তারা হিন্দু হলেও বৌদ্ধধর্মের প্রতি সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সে সময় বৌদ্ধ চিন্তা, দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নতুনভাবে বিকশিত হচ্ছিল। গুপ্ত শাসকদের উদার সাংস্কৃতিক পরিবেশ নালন্দার শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বৌদ্ধ দর্শনের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো বিষয়ও পড়ানো হতো। প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাব্যবস্থা আয়ুর্বেদেরও বিশেষ গুরুত্ব ছিল। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্ঞান ছড়িয়ে দিতেন।

নালন্দার স্থাপত্যও পরবর্তী বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণকে ঘিরে প্রার্থনাকক্ষ ও পাঠকক্ষ নির্মাণের যে রীতি সেখানে দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে তা বিভিন্ন স্থানে অনুসরণ করা হয়। এখানকার স্টুকো শিল্পের প্রভাব থাইল্যান্ডের ধর্মীয় শিল্পেও পৌঁছেছিল। তিব্বত ও মালয় উপদ্বীপেও ধাতব শিল্পের বিভিন্ন ধারার বিস্তার ঘটে।

শূন্য থেকে মহাকাশের ধারণা
ভারতীয় গণিতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্ডিত আর্যভট্ট ষষ্ঠ শতকে নালন্দার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। গণিতের ইতিহাসে তার অবদানকে যুগান্তকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কলকাতার গণিতের অধ্যাপক অনুরাধা মিত্রের ভাষায়, আর্যভট্ট সম্ভবত প্রথম ব্যক্তিদের একজন, যিনি শূন্যকে একটি স্বতন্ত্র অঙ্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এই ধারণা গাণিতিক হিসাবকে সহজ করে দেয় এবং পরবর্তী সময়ে বীজগণিত ও ক্যালকুলাসের মতো জটিল শাখার বিকাশের পথ তৈরি করে।

শূন্যের গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেন, ‘শূন্য না থাকলে কম্পিউটারও থাকত না।’

আর্যভট্ট বর্গমূল ও ঘনমূল নির্ণয়, ত্রিকোণমিতিক ফাংশন এবং গোলীয় জ্যামিতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। চাঁদের নিজস্ব আলো নেই এবং সূর্যের আলো প্রতিফলিত হওয়ার কারণেই চাঁদকে উজ্জ্বল দেখা যায়—এই বিষয়টিও তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এশিয়াজুড়ে জ্ঞানের সেতুবন্ধ
নালন্দা শুধু বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের গ্রহণ করত না, এখানকার পণ্ডিত ও শিক্ষকদেরও এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো। চীন, কোরিয়া, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও শ্রীলঙ্কায় নালন্দার পণ্ডিতদের যাতায়াত ছিল। তাদের মাধ্যমে বৌদ্ধ দর্শন, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে।

এটি প্রাচীন যুগের এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিনিময় ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল, যার প্রভাব এশিয়ার ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী হয়।

চীনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও পরিব্রাজক হিউয়েন সাং নালন্দার অন্যতম শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ছিলেন। ৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দে চীনে ফেরার সময় তিনি নালন্দা থেকে ৬৫৭টি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ সঙ্গে নিয়ে যান। দেশে ফিরে এসব গ্রন্থের একটি অংশ অনুবাদ করেন এবং বৌদ্ধ দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধধর্মের বিস্তারে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ধ্বংসের আগে একাধিকবার আঘাত
নালন্দার ইতিহাস কেবল জ্ঞান ও সমৃদ্ধির নয়; বারবার আক্রমণেরও সাক্ষী এই প্রতিষ্ঠান। ১১৯০-এর দশকে তুর্কো-আফগান সামরিক সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাহিনী নালন্দায় আক্রমণ চালায়। উত্তর ও পূর্ব ভারত জয়ের অভিযানের সময় এই জ্ঞানকেন্দ্রও তাদের আক্রমণের শিকার হয়।

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, নালন্দার গ্রন্থাগারে আগুন লাগার পর তা দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকে। বিপুলসংখ্যক পুঁথি ও জ্ঞানভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে যায়।

তবে নালন্দার ওপর এটিই প্রথম বড় আঘাত ছিল না। খিলজির আক্রমণের অনেক আগে, পঞ্চম শতকে হুন শাসক মিহিরকুলের বাহিনী নালন্দায় আক্রমণ চালিয়েছিল। অষ্টম শতকেও বাংলার গৌড় রাজ্যের আক্রমণে বিশ্ববিদ্যালয়টি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।

কেন ধ্বংস হয়েছিল নালন্দা?
নালন্দা ধ্বংসের সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত একটি ধারণা হলো, বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার এই বিশাল কেন্দ্রকে খিলজির বাহিনী প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেছিল।

তবে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। প্রখ্যাত ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ এইচ ডি সাংকালিয়া তার ১৯৩৪ সালের *দ্য ইউনিভার্সিটি অব নালন্দা* বইয়ে লিখেছিলেন, নালন্দার দুর্গসদৃশ বিশাল কাঠামো এবং বিপুল সম্পদের কারণে এটি আক্রমণকারীদের কাছে আকর্ষণীয় লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

নালন্দা জাদুঘরের পরিচালক শঙ্কর শর্মার মতে, আক্রমণের সুনির্দিষ্ট কারণ এককভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, খিলজির আক্রমণের সময় ভারতে বৌদ্ধধর্ম নিজেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অষ্টম শতাব্দী থেকে নালন্দাকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসা বৌদ্ধ পাল রাজবংশও তখন দুর্বল হয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অবক্ষয়, বৌদ্ধধর্মের পতন এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অবসান—সব মিলিয়ে খিলজির আক্রমণ নালন্দার পতনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়।

মাটির নিচে চাপা পড়ে যায় জ্ঞাননগরী
ধ্বংসের পর প্রায় ছয় শতাব্দী নালন্দা ধীরে ধীরে মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে একসময়ের বিশ্বখ্যাত জ্ঞাননগরী।

১৮১২ সালে স্কটিশ জরিপকারী ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টন স্থানটির সন্ধান পান। পরে ১৮৬১ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম নিশ্চিত করেন, এটি প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ।

বর্তমানে সেখানে প্রাচীন লাল ইটের দেয়াল, বিহার, মন্দির, পাঠকক্ষ ও স্তূপের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এসব স্থাপনা নালন্দার অতীত ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।

আগুনে হারিয়ে যায় বিশাল গ্রন্থাগার
নালন্দার অন্যতম গৌরব ছিল এর বিশাল গ্রন্থাগার। সেখানে প্রায় ৯০ লাখ হাতে লেখা তালপাতার পুঁথি ছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনটি গ্রন্থাগার ভবনের একটি ছিল নয়তলা উঁচু।

আক্রমণের সময় আগুনে এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। পালিয়ে যাওয়া কিছু সন্ন্যাসী অল্পসংখ্যক পুঁথি ও কাঠের পাতায় লেখা গ্রন্থ সঙ্গে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। সেসবের কিছু নিদর্শন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অব আর্ট এবং তিব্বতের ইয়ারলুং জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

নালন্দার গ্রেট স্টুপা
নালন্দার ধ্বংসাবশেষের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা গ্রেট স্টুপা। বিশাল এই স্মৃতিস্তম্ভটি বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শিষ্যের স্মরণে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।

অষ্টভুজাকৃতির পিরামিডের মতো দেখতে স্থাপনাটির চারপাশে ইটের সিঁড়ি, ছোট ছোট স্তূপ ও প্রার্থনাস্থল রয়েছে। প্রায় ৩০ মিটার উঁচু এই স্থাপনার দেয়ালের বিভিন্ন খোপে একসময় স্টুকোর তৈরি মূর্তি ছিল।

ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সম্রাট অশোক এটি নির্মাণ করেন। পরবর্তী আট শতাব্দীতে স্থাপনাটি একাধিকবার পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়।

আধুনিক নালন্দার পুনর্জন্ম
দীর্ঘ বিরতির পর নালন্দার শিক্ষার ঐতিহ্য নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে ১৪ জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি অস্থায়ী অবস্থান থেকে আধুনিক নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়।

আজ প্রাচীন নালন্দা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। ধ্বংস, বিস্মৃতি ও দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে নালন্দা এখনো মানবসভ্যতার জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের নাম।

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]