তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী খরায় ইউরোপের বড় নদীগুলোর পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। এর ফলে ঐতিহাসিক দানিউব ও রাইন নদীর তলদেশ থেকে একের পর এক পুরোনো নিদর্শন সামনে আসছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের জার্মান সেনাদের দেহাবশেষ ও মাইন, কোথাও দেখা মিলছে ডুবে যাওয়া যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ। আবার বুলগেরিয়ায় দানিউবের তলদেশ থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথের হাড়।
ইউরোপের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
দানিউব থেকে দুই জার্মান সেনার দেহাবশেষ
হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের কাছে দানিউব নদীর তলদেশ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের দুই জার্মান সেনার দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে একটি মোটরসাইকেল ও দুটি পরিচয়পত্রের লোহার চিহ্নও পাওয়া গেছে।
একই এলাকায় একটি টেলিমাইনও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত এই মাইনটি ছিল ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র। এটি নিরাপদে সরিয়ে নিতে ঘটনাস্থলে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী বিশেষজ্ঞদের পাঠানো হয়।
পানির স্তর আরও কমলে নদীর তলদেশে ডুবে থাকা আরও বহু জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যমান হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মানুষের দেহাবশেষ থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বুলগেরিয়ায় মিলল প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথের হাড়
দানিউবের পানি কমে যাওয়ার চিত্র শুধু হাঙ্গেরিতে নয়, পূর্ব ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়াতেও দেখা গেছে। নদীর পানি কমে যাওয়ায় রিয়াখোভো গ্রামের কাছে তলদেশে অস্বাভাবিক কিছু হাড় দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরে বিষয়টি বুলগেরিয়ার জাতীয় টেলিভিশনকে (বিএনটি) জানানো হয়। এরপর রুসে শহরের আঞ্চলিক ইতিহাস জাদুঘরের বিশেষজ্ঞরা হাড়গুলো পরীক্ষা করেন। পরীক্ষার পর তারা নিশ্চিত করেন, এগুলো ম্যামথের হাড়।
সার্বিয়ায় জার্মান নৌবহরের ধ্বংসাবশেষ
সার্বিয়াতেও দানিউবের পানি কমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের জার্মান নৌবাহিনীর কয়েকটি জাহাজের ধ্বংসাবশেষ নদীর তলদেশ থেকে দৃশ্যমান হয়েছে। দেশটির গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রাহোভো নদীবন্দরের কাছে এসব ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে।
অতিরিক্ত গরমে নদীর পানি কমে গেলে প্রায় প্রতিবছরই ওই এলাকায় ডুবে থাকা জাহাজগুলোর কিছু অংশ পানির ওপরে উঠে আসে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ওই এলাকায় জার্মান নৌবহরের বড় একটি অংশ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় জার্মান বাহিনী পিছু হটছিল এবং তাদের অনুসরণ করছিল সোভিয়েত দানিউব নৌবহর।
রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে জার্মান বাহিনী দানিউবের ওই অংশে প্রায় ২০০টি জলযান ডুবিয়ে দেয়। এর ফলে নদীপথে সোভিয়েত বাহিনীর চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।
স্লোভাকিয়ায় উঠল যুদ্ধের নৌমাইন
স্লোভাকিয়াতেও দানিউবের পানির স্তর কমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একটি নৌমাইন নদীর তলদেশ থেকে উঠে এসেছে। দেশটির কোমারনো জেলার ভির্ট এলাকার কাছে মাইনটি পাওয়া যায়।
নিরাপত্তার কারণে ওই নদীপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিসলাভার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ব্যাপক বোমা হামলা হয়েছিল। এতে অ্যাপোলো তেল শোধনাগার ও দানিউবের কাছের বন্দর এলাকা ধ্বংস হয়। সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন ব্যাহত করতে সে সময় আকাশ থেকে দানিউব নদীতে নৌমাইন ফেলা হয়েছিল।
রাইনে দেখা গেল ১৯ শতকের জাহাজ
শুধু দানিউব নয়, ইউরোপের আরেক গুরুত্বপূর্ণ নদী রাইনেও পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ফলে জার্মান অংশে নদীর তলদেশ থেকে একটি পুরোনো কাঠের পণ্যবাহী জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দৃশ্যমান হয়েছে।
জাহাজটির নাম ছিল ‘ডি হুপ’। এটি ১৯ শতকের শেষ দিকে রাইন নদীতে চলাচল করত। ১৮৯৫ সালে জাহাজটিতে ডিনামাইট তোলার সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ১৬ জন নিহত হন এবং বিস্ফোরণে জাহাজটিও ধ্বংস হয়ে যায়।
পরিবেশ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
পরিবেশবিদদের মতে, তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন নদীতে পানির স্তর কমে যাওয়ায় অতীতের এসব নিদর্শন আবার মানুষের সামনে আসছে।
তবে নদীর পানি কমে যাওয়াকে শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন আবিষ্কারের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, পানির স্তর কমে যাওয়া নৌপরিবহন, কৃষি ও পরিবেশের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
পুরো ইউরোপ এখনই পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে অঞ্চলটিতে পানির সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ/উ