ফিচার ডেস্ক

ফিচার

2026-08-18T13:43:16+06:00
2026-08-18T13:43:16+06:00
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
ফিচার
মোগলদের ‘টিস্যু পেপার’ ছিল রুমালি রুটি?
ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১:৪৩ পিএম 
রাজা-বাদশাহদের জীবনযাপন নিয়ে মানুষের কৌতূহল বরাবরই প্রবল। তাদের খাবার, পোশাক, গয়না ও বিলাসিতার নানা গল্প আজও বিস্ময় জাগায়। সেই রাজকীয় জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা খাবারের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। তেমনই একটি খাবার হলো রুমালি রুটি-পাতলা, নরম ও এতটাই মোলায়েম যে হাতে নিলে অনেকটা কাপড়ের টুকরোর মতো মনে হয়।

কাবাব, কোরমা কিংবা মাংসের বিভিন্ন মোগলাই পদের সঙ্গে রুমালি রুটি এখন বেশ পরিচিত। কেউ পরোটা, কেউ নানরুটি পছন্দ করলেও মোগলাই খাবারের সঙ্গে রুমালি রুটির আলাদা জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে এই রুটির নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ‘রুমাল’ থেকে ‘রুমালি’-অর্থাৎ রুমালের মতো পাতলা রুটি।

রুমালি রুটিকে ঘিরে সবচেয়ে প্রচলিত একটি গল্প হলো, মোগল আমলে অত্যন্ত পাতলা এই রুটি সমৃদ্ধ ও তেল-ঘিয়েভরা খাবারের সঙ্গে পরিবেশন করা হতো। এমনকি খাবার খাওয়ার সময় হাতে লেগে থাকা অতিরিক্ত তেল মুছতেও এটি ব্যবহার করা হতো বলে কথিত আছে। এ কারণেই রুমালের সঙ্গে রুটিটির নামের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন খাদ্যবিষয়ক লেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়।

তবে মোগলদের রুমালি রুটিকে ‘টিস্যু পেপার’ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ খুব বেশি নেই। ফলে এটিকে প্রচলিত খাদ্য-ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় গল্প বা কিংবদন্তি হিসেবে বিবেচনা করাই নিরাপদ।

নামেই লুকিয়ে রুটির বৈশিষ্ট্য

‘রুমাল’ শব্দটি উত্তর ভারতীয় বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হাতের রুমাল। রুমালি রুটি সাধারণত এতটাই পাতলা ও নমনীয় হয় যে সহজেই রুমালের মতো ভাঁজ করা যায়। ধারণা করা হয়, এই বৈশিষ্ট্য থেকেই রুটিটির নাম হয়েছে ‘রুমালি’।

ভারতের উত্তরাঞ্চল, পাকিস্তানের পাঞ্জান এবং মোগলাই ও আওধি খাবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই এই রুটির পরিচিতি রয়েছে। তবে এর ইতিহাস শুধু মোগল আমলের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করেন না খাদ্য-ইতিহাস নিয়ে কাজ করা অনেকেই।

মোগলদের আগেও ছিল পাতলা রুটির ঐতিহ্য?

রুমালি রুটির সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় ‘মাণ্ডা’ বা ‘মণ্ডক’-এর সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় খাদ্যসংক্রান্ত সাহিত্যে ‘মণ্ডক’ নামে পাতলা গমের রুটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

‘ভোজনকুতূহল’-এর মতো প্রাচীন খাদ্যগ্রন্থে এমন একটি পাতলা রুটির বর্ণনা রয়েছে, যা উল্টে রাখা পাত্রের ওপর তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। আজকের রুমালি রুটিও সাধারণ তাওয়ার ওপর নয়, বরং উল্টে রাখা তাওয়া বা কড়াইয়ের উত্তপ্ত পিঠে তৈরি করা হয়। এই মিলের কারণে অনেকের ধারণা, রুমালি রুটির ঐতিহ্যের শিকড় মোগল আমলেরও আগে থাকতে পারে।

মোগলদের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে?

ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যসংস্কৃতিতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রভাব ছিল ব্যাপক। মোগলদের রাজদরবারের রান্নাঘরে মধ্য এশিয়া, পারস্য ও ভারতীয় রান্নার বিভিন্ন উপাদান ও কৌশলের সমন্বয় ঘটেছিল। রুটি, মাংস ও নানা ধরনের সমৃদ্ধ খাবারও এই খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

রুমালি রুটি মোগলাই খাবারের এই ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয়তা পায় বলে বিভিন্ন খাদ্য-ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। তবে এটিকে সরাসরি ‘মোগলদের আবিষ্কার’ বলা ঠিক হবে না। বরং প্রাচীন ভারতীয় পাতলা রুটির ঐতিহ্য, উত্তর-পশ্চিম ভারত ও পাঞ্জাবের খাদ্যসংস্কৃতি এবং মোগল দরবারের রান্নার প্রভাব-সব মিলিয়েই রুমালি রুটির বর্তমান রূপ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হয়।

কীভাবে তৈরি হয় রুমালি রুটি?

রুমালি রুটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য এর তৈরির পদ্ধতি। ময়দা বা আটা দিয়ে তৈরি নরম ডোকে অত্যন্ত পাতলা করে টেনে বা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দক্ষ রাঁধুনিরা কখনো হাতের তালুতে কিংবা বাতাসে ঘুরিয়েও রুটিকে এতটাই পাতলা করে ফেলেন যে তা প্রায় স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

এরপর সাধারণ তাওয়ার পরিবর্তে উল্টে রাখা কড়াই বা তাওয়ার উত্তপ্ত পিঠে অল্প সময়ের জন্য সেঁকে নেওয়া হয়। এতে রুটিটি নরম, নমনীয় এবং সহজে ভাঁজ করার মতো পাতলা হয়।

রাজদরবার থেকে রেস্তোরাঁয়

মোগল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাওয়ার পর দিল্লির পাশাপাশি লখনৌ, হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন শহরে মোগলাই খাদ্যসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে। সেই ধারার সঙ্গে রুমালি রুটিও পৌঁছে যায় ভারতীয় উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে।

পরবর্তী সময়ে ধাবা, কাবাবের দোকান, বিয়ের অনুষ্ঠান ও রেস্তোরাঁয় রুমালি রুটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দিল্লির বিখ্যাত করিমসের ইতিহাসেও মোগলাই খাবারের সঙ্গে রুমালি রুটি পরিবেশনের যোগ রয়েছে। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রেস্তোরাঁ মোগল ঘরানার খাবার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম পরিচিত উদাহরণ।

আজ রুমালি রুটি কোনো রাজদরবারের খাবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কাবাব কিংবা কোরমার পাশে ভাঁজ করা এই পাতলা রুটি দক্ষিণ এশিয়ার রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে।

আর মোগলদের ‘টিস্যু পেপার’ হিসেবে রুমালি রুটি ব্যবহারের গল্প সত্য হোক বা আকর্ষণীয় কিংবদন্তি-রুমালের মতো পাতলা ও নরম হওয়ার কারণেই এই রুটি অন্য অনেক রুটির চেয়ে আলাদা। ইতিহাস, লোককথা ও খাবারের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রুমালি রুটি আজ ভোজনরসিকদের পাতে নিজের আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া ফুড, মাফিনা

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]