নাটোরের গুরুদাসপুরে পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম হত্যা মামলায় আরও দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এর আগে এ মামলায় নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। শনিবার সকালে লালপুর আমলি আদালতের বিচারক মো. সাদ্দাম হোসেন নতুন করে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কারাগারে পাঠানো দুই আসামি হলেন বড়গ্রাম উপজেলার কচুগাড়ি দ্বাড়ীকুসি গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে মো. আলামিন (৩৮) এবং গুরুদাসপুর পৌরসভার খামার নাচকৈর মহল্লার নূর মোহাম্মদের ছেলে আনিছুর রহমান (৪২)। শুক্রবার ভোর ৩টার দিকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে তাঁদের আটক করা হয়। পরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শাকিল হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নুরুজ্জামান মিন্টুকে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। মিন্টুর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আলামিন ও আনিছুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়। প্রাথমিকভাবে মামলার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত এ মামলায় নতুন করে কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি।
ওসি আরও জানান, শুক্রবার মিন্টুর রিমান্ড শেষ হলে তাঁকে আদালতে হাজির করে নতুন করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন গ্রহণ করলেও শুনানি না করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে রিমান্ড আবেদনের শুনানির জন্য কোনো তারিখ ধার্য করা হয়নি।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। হামলাকারীরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক পিজি হাসপাতাল) ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর শাকিলের বাবা রবিউল ইসলাম থানায় মামলা করেন। শাকিলের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৬ অক্টোবর সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শাকিল মারা যান। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর মিন্টুকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়।
শাকিলের জানাজার পর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে আমেরিকাপ্রবাসী রাসেলের একটি শপিংমলে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়। বুধবার সকাল থেকে তাঁর একটি আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাঁকে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় করণীয় নির্ধারণে শুক্রবার সকালে বৈঠকে বসে নাটোর জেলা বিএনপি। প্রায় আট ঘণ্টা বৈঠক চললেও নাটোর-৪ (গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আজিজের দলীয় পদ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি দলটি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে সুপারিশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আমরা সবগুলো ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের কাছে আব্দুল আজিজের পরিচয় তিনি জেলার সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। এ ছাড়া তিনি একজন সংসদ সদস্য। তাই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জেলা কমিটির ক্ষমতা নেই কোনো যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার। সর্বসম্মতিক্রমে এ বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত দলের উচ্চপর্যায়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।’
জেলা বিএনপির একটি সূত্রের দাবি, আব্দুল আজিজের ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি সত্য এবং এর কারণে তাঁর নৈতিক স্খলনের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা দলের ওপরও প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতিতে শুক্রবারের বৈঠকে জেলা বিএনপির সদস্যরা সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সভায় শাকিল হত্যা মামলায় রিমান্ড শেষে কারাগারে থাকা মিন্টুর বিরুদ্ধে ওঠা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং আব্দুল আজিজের ভাইরাল ভিডিও নিয়ে সদস্যরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। পরে দলের গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে জেলা পর্যায় থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কেন্দ্রীয় বিএনপিকে জানানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহত শাকিলের গুরুদাসপুর পৌরসভার খোয়ারপাড়া-খামার নাচকৈড় এলাকার বাড়িতে যান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল হাসান রাকিব। তাঁরা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং অপরাধী যে-ই হোক, সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
জ/উ