সব শঙ্কা ও ভয় উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও বিদায়ের করুণ সুরের মধ্য দিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে পাঁচ দিনের এ উৎসব। মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের বাসনা, ক্রোধ, হিংসা ও লালসার মতো আসুরিক প্রবৃত্তি বিসর্জন দেওয়াই বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এসব প্রবৃত্তি ত্যাগ করে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের প্রধান উদ্দেশ্য।
গত ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথিতে চণ্ডীপাঠ, বোধন ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে ‘আনন্দময়ীর’ আগমনে শুরু হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। পরবর্তী পাঁচ দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভক্তরা। দশমী তিথিতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব।
এবারের দুর্গাপূজায় অতীতের তুলনায় বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। ছোটখাটো কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া উৎসবজুড়ে ছিল আনন্দমুখর পরিবেশ। পূজা উপলক্ষে সরকার প্রথমবারের মতো পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা করে। বাড়ানো হয় অনুদানের পরিমাণও। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারপ্রধান ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় গিয়ে দুর্গাপূজা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এসব উদ্যোগে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দেয়। তাঁদের মধ্যে এই অনুভূতি তৈরি হয় যে সরকার তাঁদের পাশে রয়েছে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরের দুর্গাপূজায় আতঙ্ক ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে গত দুই বছরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের এ ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এবারের পূজায় যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, সে জন্য তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ছয় হাজার এসআরবি সদস্য মোতায়েন করা হয়। এ ছাড়া সাড়ে ৫০০ পিকআপ ও সাড়ে ৪০০ মোটরসাইকেল নিয়ে দৃশ্যমান টহল পরিচালনা করা হয়। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাড়ানো হয় গোয়েন্দা নজরদারি। গুরুত্বপূর্ণ পূজামণ্ডপ ও স্থানে এসআরবির ডগ স্কোয়াড এবং বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট প্রয়োজনীয় তল্লাশি চালায়। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয় স্পেশাল ফোর্স টিম। পাশাপাশি পর্যাপ্তসংখ্যক সদস্য রিজার্ভ রাখা হয়। এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার কারণে এবারের পূজায় কোনো ধরনের ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত পূজামণ্ডপ ঘিরে ৪৬টি ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয় এবং ২১টি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পূজামণ্ডপ ঘিরে সংঘটিত ৪৭টি ঘটনার মধ্যে ৩০টি ভাঙচুর, চারটি চুরি, তিনটি অগ্নিসংযোগ এবং আরও ১০টি অন্যান্য ঘটনা ছিল। এসব ঘটনায় মোট ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গত বছরও দুর্গাপূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আতঙ্কে অনেকে পূজামণ্ডপ বন্ধ করে দেন। গুজব ছড়িয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছিল। এবারও দুর্গাপূজায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র ছিল এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেছিল একাধিক স্বার্থান্বেষী মহল-এমন অভিযোগও রয়েছে।
প্রতি বছর দুর্গাপূজার আগে প্রতিমা ভাঙচুরের একাধিক ঘটনায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এবারও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নিরাপদে দুর্গোৎসব পালন করা যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন অনেকে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরও দেশে মৌলবাদীদের প্রভাব থাকবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছিল। এমন শঙ্কার মধ্যেই পূজার আয়োজন করেছিলেন হিন্দুরা।
এমন পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের উদ্যোগ নেন। শারদীয় দুর্গাপূজার মণ্ডপ দেখতে তিনি রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম সফর করেন।
সম্প্রীতির বার্তা দিতে পূজার শেষ দিকে, অর্থাৎ নবমীতে, দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার উত্তরাঞ্চলের একাধিক জেলার দুর্গামণ্ডপ ঘুরে দেখেন তিনি। পরিদর্শন করেন রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরও। সেখানে উপস্থিত হয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্দেশে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান এবং ভক্তদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
এ সময় দর্শনার্থী ও ভক্তদের অনুরোধে হাসিমুখে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলেন প্রধানমন্ত্রী। পরে রংপুর থেকে রাজশাহীর ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন তিনি। সেখানেও পূজারিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানান।
রংপুর ও রাজশাহীর দুটি মণ্ডপ পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার রাত ৮টা ২০ মিনিটে চট্টগ্রামের জে এম সেন হলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখা গত ৪০ বছর ধরে সেখানে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছে। পরিষদের নেতারা জানান, এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী জে এম সেন হলে দুর্গাপূজা দেখতে এলেন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন পূজামণ্ডপে উৎসবের মধ্যেও বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ তৈরি করে। সড়কের দুই পাশে দাঁড়িয়ে উলুধ্বনির মাধ্যমে তাঁকে স্বাগত জানান উপস্থিত ব্যক্তিরা।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঐতিহাসিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তিন জেলার পূজামণ্ডপে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বদলে যাওয়া বাংলাদেশের রূপকল্প তুলে ধরেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার যে প্রত্যয় তিনি ব্যক্ত করেছেন, তাঁর বক্তব্যে তার প্রতিফলন দেখা যায়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিভিন্ন ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করে দেশ স্বাধীন করার জন্য লড়াই করেছিল। পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সব ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নেমেছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, সেই আন্দোলনেও দল, মত, ধর্ম ও বর্ণনির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছিল।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করে আসছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও সবার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আমাদের সব ধর্ম-মতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করে আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে হবে।’
দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, জনগণ দেশে স্থিতিশীলতা চায়, শান্তিতে ও নিরাপদে থাকতে চায়। সরকারও সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্যে তাঁর প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি যে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছেন, তা বাস্তবায়নের উদ্যোগও নিয়েছেন। সরেজমিনে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তিনি সবার জন্য একটি নিরাপদ ও সম্প্রীতিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় তুলে ধরেছেন।
জ/উ