ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভ ও লুটপাটের ঘটনায় রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকাসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে প্যারিসের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় মানুষের চলাচল এবং অনুমতি ছাড়া জনসমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত প্লাস দে লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় কারফিউ কার্যকর থাকবে। এ ছাড়া শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার আরও কয়েকটি স্থানে অনুমতি ছাড়া জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
তরুণদের চলাচল ও জনসমাগম সীমিত করতে দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নিসে বিশেষ কারফিউ জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি মার্সেই, বোর্দো ও লিওঁসহ বিভিন্ন শহর এবং উত্তরের লিল শহরেও আংশিক কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। তাঁর অভিযোগ, ২০২৭ সালের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ‘বিশৃঙ্খলা তৈরি’ করতে ‘অতি-বামপন্থী চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো’ বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছে। জরুরি বৈঠক শেষে সোমবার লেকর্নু বলেন, ‘শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমি সম্পূর্ণ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
এর আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেন, কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সংঘটিত সহিংসতায় প্রায় দুই হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত মাসে রাজধানীর জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, শিক্ষকসংকট ও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন পরে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কমানোর দাবিতে বিস্তৃত হয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর উত্তরসূরি নির্বাচনের আর ছয় মাস বাকি থাকতেই ফ্রান্সে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।
চলতি সপ্তাহে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। ঐতিহাসিক স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটসহ নানা ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে এই পরিস্থিতিকে। এসব ঘটনায় এরই মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা জারি করা হলে জনশৃঙ্খলা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষমতার বাইরে গিয়ে সাময়িক বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে। এসব ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে কারফিউ জারি, মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ এবং জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেন, ‘টেলিভিশন দেখে ফরাসিরা মনে করছেন, সর্বত্র বিশৃঙ্খলা চলছে। সৌভাগ্যক্রমে, বাস্তবতা এমন নয়। শহরাঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মূলত অস্থিরতা চলছে।’
বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী সের্ঝ পাপাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভ ও সহিংসতায় অন্তত তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন লেকর্নু।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ। সপ্তাহ শেষে কয়েকটি শহরে পুলিশ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বলে মন্তব্য করেন নুনেজ। সোমবার মাখোঁর দপ্তর জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট। এর পরিবর্তে সড়কে ব্যারিকেড ও লুটপাট বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন মাখোঁ।
একই সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আগাম পরিস্থিতি আঁচ করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ছিল বলেও উল্লেখ করেছেন প্রেসিডেন্ট। এ বিষয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নুর পাশে দাঁড়িয়ে সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ জানান, লুটপাট ও ভাঙচুর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ সোমবার সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্যদের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে।’
আগামী বসন্তের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ‘উগ্র বামপন্থি আন্দোলন’ দেশজুড়ে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন লেকর্নু। তিনি বলেন, ‘এমন একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে, যাদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়সূচি এবং নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যও সক্রিয় করা হতে পারে।’
জ/শা