ভ্রমণ ডেস্ক

ভ্রমণ

2026-09-02T21:01:57+06:00
2026-09-02T21:01:57+06:00
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলা English
বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
ভ্রমণ
মুঘল স্মৃতির অনন্য নিদর্শন লালবাগ কেল্লা
ভ্রমণ ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:০১ পিএম 
পুরান ঢাকার লালবাগে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে মুঘল আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে লালবাগ কেল্লা। সময়ের সঙ্গে ঢাকার নগরচিত্র যেমন বদলেছে, তেমনি বুড়িগঙ্গাও সরে গেছে অনেক দূরে। তবে ইতিহাসের নানা অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে লালবাগ কেল্লা এখনো ধারণ করে আছে কয়েক শতাব্দীর স্মৃতি। এর আদি নাম ছিল ‘কেল্লা আওরঙ্গবাদ’।

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা মুহম্মদ আজম বাংলার সুবেদার থাকাকালে ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে কেল্লাটির নির্মাণকাজ শুরু করেন। তবে কাজ শেষ হওয়ার আগেই সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লিতে ডেকে পাঠান। পরে তার উত্তরসূরি শায়েস্তা খান ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করলেও দুর্গটির নির্মাণ সম্পন্ন করেননি।

নির্মাণকাজ চলার সময় ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খানের কন্যা বিবি পরি এখানে মারা যান। তার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খান দুর্গটিকে অপয়া মনে করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। এ কারণে মুঘল আমলের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনাটি অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই থেকে যায়।

দুর্গের ভেতরে যা আছে
বর্তমানে লালবাগ কেল্লার প্রায় অর্ধেক অংশ দৃশ্যমান। এর বাকি অংশ দক্ষিণ দিকে ছিল বলে জানা যায়। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা দুর্গের ভেতরে রয়েছে তিন গম্বুজের একটি মসজিদ, একটি সমাধি ভবন এবং দোতলা দরবার হলসহ একটি হাম্মামখানা।

দুর্গের পশ্চিম দিকে উঁচু স্থানে পূর্ব-পশ্চিমমুখী দীর্ঘ এক সারি ফোয়ারা ও পানি সংরক্ষণের জন্য একটি জলাধার ছিল। এই জলাধার থেকেই পুরো দুর্গে পানি সরবরাহ করা হতো। দক্ষিণ দিকে ছিল একটি পুকুর। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি তোরণ এবং পূর্বদিকে দুটি তোরণ রয়েছে। আদি সময়ে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের তোরণটিই ছিল দুর্গের প্রধান প্রবেশপথ।

একসময় বুড়িগঙ্গা নদী দুর্গের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে প্রবাহিত হতো। বর্তমানে নদীটি অনেক দূরে সরে গেছে। দুর্গ নামে পরিচিত হলেও স্থাপনাটি উদ্যানঘেরা একটি মাজার কমপ্লেক্স ছিল বলেও ধারণা করা হয়।

তিন গম্বুজের মসজিদ
দুর্গের পশ্চিম অংশে রয়েছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। দুটি পার্শ্বীয় খিলানের মাধ্যমে মসজিদটির অভ্যন্তর তিন ভাগে বিভক্ত। পূর্বদিকে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ এবং কিবলামুখী দেয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব। মসজিদের পূর্ব পাশে ওজুর জন্য একটি জলাধারও রয়েছে।

মসজিদের অভ্যন্তরের দেয়ালের ওপরের দিকে কয়েকটি উৎকীর্ণ লিপি দেখা যায়। এসব লিপির তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি ১০৯৫ হিজরি বা ১৬৮৩-৮৪ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়। সে সময় বাংলার সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খান।

মসজিদের উত্তর-পূর্ব কক্ষের দেয়ালে কয়েকটি আদি গ্রেজড টাইলস এখনো রয়েছে। আরও কিছু টাইলস সেখান থেকে সরিয়ে জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

সমাধি ভবনের চারপাশে চারটি জলাধার ছিল এবং এসব জলাধারের মধ্যে ফোয়ারা থাকারও তথ্য পাওয়া যায়। দক্ষিণ পাশের ফোয়ারাটি পরে বন্ধ করে সেখানে কয়েকজনকে সমাহিত করা হয়।

হাম্মাম-সংযুক্ত দেওয়ান-ই-আম
দুর্গের পশ্চিম দিকে রয়েছে হাম্মাম-সংযুক্ত দেওয়ান-ই-আম। বিশাল এই ভবনটির সঙ্গে যুক্ত হাম্মাম কমপ্লেক্সে ছিল একটি খোলা প্ল্যাটফর্ম, ছোট রান্নাঘর, চুল্লি, পানির আধার, ইট দিয়ে তৈরি পাকা বাথটাব, শৌচাগার, ড্রেসিং রুম ও একটি অতিরিক্ত কক্ষ।

হাম্মামখানায় পানি গরম করার জন্য ভূগর্ভস্থ একটি কক্ষ ছিল। ঝাড়ুদারদের ব্যবহারের জন্যও একটি অলিন্দ রাখা হয়েছিল। হাম্মামখানার পশ্চিম ফ্যাসাদের সামনে উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত দীর্ঘ একটি বিভাজন দেয়াল পুরো দুর্গকে দুটি অংশে ভাগ করেছিল।

বিবি পরির সমাধিসৌধ
লালবাগ কেল্লার বর্তমান ভবনগুলোর মধ্যে বিবি পরির সমাধিসৌধটি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা। বিবি পরির সমাধি থাকা বর্গাকার কেন্দ্রীয় কক্ষটি অষ্টভুজাকৃতির মেকি গম্বুজে আবৃত। কেন্দ্রীয় কক্ষের চারপাশে রয়েছে আটটি কক্ষ।

কেন্দ্রীয় কক্ষের ভেতরের দেয়াল সাদা মার্বেল দিয়ে আবৃত। পাশের কেন্দ্রীয় চারটি কক্ষের দেয়াল আট মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পাথর দিয়ে মোড়ানো। বাকি চার কোণের কক্ষ চকচকে টাইলসে আবৃত। এসব টাইলস নতুন করে স্থাপন করা হলেও দুটি পুরোনো টাইলস এখনো রয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব কোণের কক্ষে একটি সমাধি রয়েছে। ধারণা করা হয়, এটি সম্ভবত বিবি পরির কোনো আত্মীয় শামশাদ বেগমের সমাধি।

সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিও রয়েছে
লালবাগ কেল্লার ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহও একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। বিদ্রোহের সময় অনেক সিপাহি দুর্গটিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে ইংরেজদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ওই যুদ্ধে অনেক সিপাহি নিহত হন এবং অনেকে বন্দি হন। বন্দিদের আন্টাঘর ময়দানে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে লালবাগ দুর্গে সুলতানি যুগ ও প্রাক-মুসলিম যুগের বিভিন্ন স্তরের সন্ধানও পাওয়া গেছে। এখান থেকে পোড়ামাটির মস্তক, ফলকসহ বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন উদ্ধার করা হয়েছে।

এখনো দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ
বর্তমানে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ লালবাগ কেল্লা দেখতে আসেন। ছুটির দিনগুলোতে দর্শনার্থীর ভিড় আরও বাড়ে। ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের কাছে ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে এখনো গুরুত্ব ধরে রেখেছে মুঘল আমলের এই স্থাপনাটি।

প্রাতঃভ্রমণের জন্য লালবাগ কেল্লা সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এ সময়ে প্রবেশের টিকিটের মূল্য ৫ টাকা। এরপর সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুযোগ থাকে এবং এ সময়ে টিকিটের মূল্য ৩০ টাকা।

মুঘল আমলের স্মৃতি, বিবি পরির সমাধি, প্রাচীন স্থাপত্য, ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন-সব মিলিয়ে লালবাগ কেল্লা আজও ঢাকার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে। চারপাশের পরিবেশ ও নগরচিত্র বদলে গেলেও অতীতের স্মৃতি ধারণ করে স্থাপনাটি এখনো দাঁড়িয়ে আছে তার ঐতিহাসিক মহিমায়।

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
ভ্রমণ - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]