জবাবদিহি ডেস্ক

ভ্রমণ

2026-08-27T12:36:54+06:00
2026-08-27T12:36:54+06:00
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
ভ্রমণ
দুর্গম পাহাড়ে ঝর্ণার গর্জন, বর্ষায় রাঙ্গামাটিতে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের হাতছানি
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম 
আকাশজুড়ে মেঘ, চারপাশে গাঢ় সবুজ পাহাড় আর নিরবচ্ছিন্ন জলপ্রপাতের গর্জন—বর্ষায় রাঙ্গামাটির দুর্গম পাহাড়ি ঝর্ণাগুলো যেন নতুন রূপ ফিরে পায়। কাপ্তাই হ্রদ ও ঝুলন্ত ব্রিজের পরিচিত গণ্ডি পেরিয়ে জেলার গহীন অরণ্য ও পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য ঝর্ণা এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র।

পার্বত্য চট্টগ্রামের এই জেলায় ছোট-বড় পাহাড়, উপত্যকা ও কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি প্রকৃতিকে দিয়েছে আলাদা বৈচিত্র্য। বর্ষায় পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির পানি তৈরি করে অসংখ্য ছোট-বড় ঝর্ণা ও জলপ্রপাত। দুর্গম পাহাড়ি পথে কোথাও ঝিরিপথ, কোথাও খাড়া ঢাল আবার কোথাও পিচ্ছিল পাথর পেরিয়ে এসব ঝর্ণায় পৌঁছাতে হয়।

সুবলংয়ে সহজেই মেলে ঝর্ণার সৌন্দর্য

কাপ্তাই হ্রদ দিয়ে বোটে করে সুবলংয়ের দিকে এগোলেই দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সুবলং ঝর্ণা। বর্ষায় ঝর্ণাটি পূর্ণ যৌবন ফিরে পায়। ওপর থেকে নেমে আসা পানির ধারা চারপাশে তৈরি করে কুয়াশাময় পরিবেশ। অন্য অনেক দুর্গম ঝর্ণার তুলনায় এখানে পৌঁছানো সহজ হলেও সৌন্দর্যে এর কোনো কমতি নেই।

ধুপপানিতে রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা

বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের গহীন পাহাড়ে অবস্থিত ধুপপানি ঝর্ণা। স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ‘ধুপ’ অর্থ সাদা; অর্থাৎ ধুপপানি বলতে ‘সাদা পানির ঝর্ণা’ বোঝায়। এখানে পৌঁছাতে খাড়া পাহাড়, ঝিরিপথ ও পিচ্ছিল পাথর পেরিয়ে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়।

ঝর্ণার সামনে পৌঁছালে দেখা যায়, ওপর থেকে দুধসাদা ফেনিল পানির ধারা নিচে আছড়ে পড়ছে। ধুপপানির আরেকটি আকর্ষণ ঝর্ণার ভেতরের দিকে থাকা প্রাকৃতিক গুহা, যেখান থেকে পানির পর্দার দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

মুপ্পোছড়া ও ন’কাটাছড়ায় নির্জনতার স্বাদ

কাপ্তাই ও বিলাইছড়ির গহীন অরণ্যে থাকা মুপ্পোছড়া ও ন’কাটাছড়া ঝর্ণাও ট্র্যাকিংপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়। পাথুরে দেয়াল বেয়ে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারা এবং চারপাশের ঘন সবুজ বন এসব ঝর্ণাকে দিয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।

এ ছাড়া বিলাইছড়ির গাছকাটা ঝর্ণা, শতপাপড়ি ঝর্ণা ও সাইনপুকুর এলাকার জলপ্রপাতও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। সাজেকের হাজাছড়া, বাঘাইছড়ির সিজক এবং লংগদুর শিলাছড়া ঝর্ণাও পর্যটকদের কাছে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি লংগদুর শিলাছড়া ঝর্ণা ঘুরে আসা স্থানীয় তরুণদের একটি দলের সদস্য তানভীর ইসলাম বলেন, ‘দুর্গম সৌন্দর্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝর্ণাগুলোর মূল আকর্ষণ। তবে এ সম্ভাবনাকে টেকসই পর্যটনে রূপ দিতে নিরাপত্তা ও সুব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।’

নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর প্রয়োজন

শিলাছড়া ঝর্ণাকে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পিচ্ছিল ঝিরিপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তা দড়ি বা রেলিং, দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড এবং জরুরি যোগাযোগ ও ফার্স্ট এইডের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন রয়েছে। অভিজ্ঞ স্থানীয়দের নিবন্ধিত গাইড হিসেবে যুক্ত করা হলে পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া পাহাড়ি পরিবেশের ক্ষতি না করে কাঠ বা বাঁশের বিশ্রামাগার এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালুর কথাও বলা হচ্ছে।

দুর্গম ঝর্ণায় ভ্রমণ শুধু জলপ্রপাত দেখা নয়, এটি অনেকটা অ্যাডভেঞ্চার অভিযানের মতো। বোটযাত্রার পর শুরু হয় ট্র্যাকিং। কখনো পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ, কখনো খাড়া টিলা আবার কখনো উরুসমান পানির ঝিরিপথ পেরিয়ে এগোতে হয়। এর সঙ্গে জোঁকের উপদ্রব, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ঘন জঙ্গলের পরিবেশ ভ্রমণের রোমাঞ্চ আরও বাড়িয়ে দেয়।

পাহাড়ি জনজীবনের সঙ্গে পরিচয়

ঝর্ণা ভ্রমণের পথে পর্যটকদের স্থানীয় পাহাড়ি জনজীবনের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। পাহাড়ের ঢালে দেখা যায় চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মাচাং ঘর। স্থানীয়দের জীবনযাত্রা, আতিথেয়তা এবং পাহাড়ি জুমের খাবার পর্যটকদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।

তবে অপরিকল্পিত পর্যটনের কারণে এসব প্রাকৃতিক স্থানের পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও বাড়ছে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেটসহ বিভিন্ন বর্জ্য পাহাড় ও ঝর্ণার পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করছে।

গাইডদের মাধ্যমে বাড়ছে নিরাপদ ভ্রমণ

দুর্গম কয়েকটি ঝর্ণায় স্থানীয় প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীর নজরদারি রয়েছে। বিশেষ করে ধুপপানি ঝর্ণা ভ্রমণের ক্ষেত্রে পর্যটকদের পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে প্রশিক্ষিত ট্যুরিস্ট গাইডদের একটি দলও কাজ করছে।

ধুপপানি, গাছকাটা ও মুপ্পোছড়া ঝর্ণায় যেতে স্থানীয় গাইডের সহযোগিতা নেওয়ার প্রয়োজন হয়। ধুপপানির পথে বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের উলুছড়ি এলাকা থেকে হাঁটা শুরু হয়। সেখানেই গাইডরা পর্যটকদের সঙ্গে যুক্ত হন এবং গন্তব্যে নিয়ে গিয়ে আবার ফিরিয়ে আনেন।

বিলাইছড়ির গাছকাটাছড়া, মুপ্পোছড়া ও ধুপপানি ঝর্ণাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কমিউনিটি বেইজ ইকোট্যুরিজম ম্যানেজমেন্ট কমিটি। ২০২১ সালে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ২১ সদস্যের এই কমিটির মাধ্যমে ৪০ জন গাইড কাজ করছেন।

কমিটির সাধারণ সম্পাদক আথুই মারমা বলেন, ‘আমরা কোনো ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কমিটি গঠন করিনি। কমিটি হওয়ার আগেও এখানে পর্যটকেরা আসছেন। তবে এখানকার প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি যাতে না হয়, সে বিষয়ে সজাগ থাকার জন্যই এই গাইড নিয়োগ ও কমিটি গঠন করা হয়।’

তিনি জানান, সাধারণত ১০ জনের একটি পর্যটক দলের জন্য একজন গাইড দেওয়া হয় এবং গাইডের জন্য ১ হাজার টাকা ফি নেওয়া হয়। পর্যটকদের অনুরোধে কখনো একজন গাইডের সঙ্গে ১৪-১৫ জনও যেতে পারেন। বছরে ৩ থেকে ৪ মাস পর্যটকেরা যাতে নিরাপদে ঝর্ণা ভ্রমণ করতে পারেন এবং পরিবেশের ক্ষতি না হয়, সেটিই তাদের লক্ষ্য। তবে যাতায়াতের সুবিধার জন্য কিছু পাহাড়ি পথে সিঁড়ি নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।

যোগাযোগ ও নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ

স্থানীয় ট্যুর অপারেটর হিমু বাপ্পী বলেন, বর্ষায় কাপ্তাই লেক ও আশপাশের ঝর্ণাগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বৃষ্টির পানিতে সুবলং, ধুপপানিসহ অন্যান্য ঝর্ণার প্রবাহ বেড়ে যায়। বোটে করে ঝর্ণার কাছাকাছি গিয়ে পানির কণা উপভোগ করা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করে।

তবে তিনি জানান, হ্রদের দূরবর্তী দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য আধুনিক নৌযান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল এবং সড়ক যোগাযোগ নেই। ফলে কোনো পর্যটক অসুস্থ বা আহত হলে তাকে দ্রুত উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে রাঙ্গামাটির দুর্গম ঝর্ণাগুলোতে প্রকৃতি, পাহাড় ও অ্যাডভেঞ্চারের অনন্য সমন্বয় রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে টেকসই পর্যটনে রূপ দিতে হলে পরিবেশ সংরক্ষণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা, স্থানীয় গাইড ব্যবস্থাপনা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পাহাড়ের সবুজ আর ঝর্ণার শুভ্রতার এই প্রাকৃতিক সম্পদ দীর্ঘদিন পর্যটকদের আকর্ষণ করে যেতে পারে।

জ/উ





Advertisement
Loading...
Loading...
ভ্রমণ - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]