মুসলিম আইনে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কী?

ধর্ম ডেস্ক

ইসলাম ও জীবন

2026-11-05T17:36:34+06:00
2026-11-05T17:36:34+06:00
বৃহস্পতিবার ● ৫ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
ইসলাম ও জীবন
মুসলিম আইনে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার কী?
ধর্ম ডেস্ক
⏲ ৫:৩৬ পিএম | ৫ নভেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
সংগৃহীত ছবি
আধুনিকতার ছোঁয়ায় সমাজে অনেক পরিবর্তন এলেও সম্পত্তির অধিকার নিয়ে এখনো বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন বহু নারী। বিশেষ করে পরিবারের সদস্য বা স্বজনদের কাছ থেকেই অনেক সময় নিজেদের প্রাপ্য সম্পত্তি বুঝে পান না তাঁরা। যুগের পর যুগ সামাজিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটলেও মুসলিম আইনে উত্তরাধিকার হিসেবে নারীর প্রাপ্য অংশ কতটুকু, তা সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। গ্রামাঞ্চলের পাশাপাশি শহরেও এ বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে।

ইসলামী শরিয়ত ও প্রচলিত মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ছেলে ও মেয়ের উত্তরাধিকারী অংশের অনুপাত দুইয়ের বিপরীতে এক। অর্থাৎ, একই শ্রেণির উত্তরাধিকারী হিসেবে ছেলে ও মেয়ে থাকলে ছেলে সাধারণত মেয়ের দ্বিগুণ অংশ পায়। তবে উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি, জীবিত উত্তরাধিকারীর সংখ্যা ও সম্পর্কের ধরন অনুযায়ী হিসাব পরিবর্তিত হতে পারে।

বাবা-মায়ের সম্পত্তির পাশাপাশি জীবনের বিভিন্ন সম্পর্কের সূত্রেও নারীর সম্পত্তির অধিকার তৈরি হয়। বিয়ে, স্বামীর মৃত্যু কিংবা সন্তানের উত্তরাধিকার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই মুসলিম আইনে নারীর জন্য নির্দিষ্ট অধিকার রয়েছে।

বিয়ে শুধু দুটি মানুষের সম্পর্ক নয়, এটি একটি সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। মুসলিম বিয়েতে স্ত্রীর জন্য স্বামীর পক্ষ থেকে দেনমোহর নির্ধারণ করা বাধ্যতামূলক। এটি স্ত্রীর নিজস্ব আর্থিক অধিকার এবং স্বামীর কাছ থেকে তাঁর প্রাপ্য পাওনা।

বিয়ের সময় নির্ধারিত দেনমোহর তাৎক্ষণিক বা বিলম্বিত—যে পদ্ধতিতেই নির্ধারণ করা হোক, স্ত্রী তা আদায়ের অধিকার রাখেন। স্বামী জীবদ্দশায় দেনমোহর পরিশোধ না করলে স্ত্রী আইনগতভাবে তা দাবি করতে পারেন। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পরও এই পাওনা বিলুপ্ত হয় না। তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের আগে দেনমোহরসহ অন্যান্য দায় পরিশোধ করতে হয়।

ইসলামী বিধানে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব মূলত পুরুষের ওপর অর্পণ করা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় নারীর ভরণপোষণ ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

একজন পুরুষ উপার্জনে সক্ষম হলে পরিবারের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর বিভিন্ন কর্তব্য বর্তায়। যেমন-

- স্বামী হিসেবে স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা।
- বাবা হিসেবে সন্তানদের খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা।
- বাবা হিসেবে মেয়ের বিয়ের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করা।
- ভাই হিসেবে সামর্থ্য ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী ছোট ভাইবোনদের দেখাশোনা করা এবং অবিবাহিত বোনের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা।

বাংলাদেশে মা-বাবার ভরণপোষণ নিশ্চিত করার বিষয়েও পৃথক আইন রয়েছে। মুসলিম আইনের বিধান অনুযায়ী, পরিবারের এসব আর্থিক দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতা সাধারণভাবে নারীর ওপর চাপানো হয়নি। স্ত্রী, মেয়ে কিংবা বোন হিসেবে একজন নারী স্বেচ্ছায় পরিবারের খরচে অংশ নিতে পারেন; তবে তাঁর নিজস্ব সম্পত্তি বা আয় থেকে এসব ব্যয় বহন করতে তাঁকে বাধ্য করা যায় না।

উত্তরাধিকার সূত্রে একজন নারী শুধু বাবা-মায়ের সম্পত্তির অংশীদার হন না। সম্পর্কের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বামী কিংবা সন্তানের সম্পত্তিতেও তাঁর অধিকার তৈরি হতে পারে।

বাবা-মায়ের সন্তান হিসেবে একজন নারী উত্তরাধিকারী হন। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী হিসেবেও তিনি স্বামীর সম্পত্তিতে নির্ধারিত অংশ পান। একইভাবে কোনো সন্তানের মৃত্যু হলে মা হিসেবে তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার অধিকার রয়েছে।

অর্থাৎ, একজন নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক সম্পর্কের সূত্রে সম্পত্তির মালিক হতে পারেন। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর প্রাপ্য অংশ নির্ভর করে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক, অন্য জীবিত উত্তরাধিকারী এবং মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের বিধানের ওপর। তাই শুধু বাবা-মায়ের সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের অংশের তুলনা দিয়ে একজন নারী বা পুরুষের সামগ্রিক সম্পত্তির পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।

মুসলিম আইনে নারীর সম্পত্তির অধিকার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে অনেক নারী তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে বাবার সম্পত্তির ভাগ চাওয়াকে কেন্দ্র করে সামাজিক চাপ, পারিবারিক বিরোধ ও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় তাঁদের।

এ বিষয়ে এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মুসলিম আইনে নারীদের সম্পত্তির যে অধিকার রয়েছে, তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে কোনো নারী উত্তরাধিকার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন না। আমাদের দেশের বেশির ভাগ মুসলিম নারী আইন অনুযায়ী তাঁদের প্রাপ্য অধিকার পান না। এর ফলে স্বামী মারা গেলে বা বিবাহবিচ্ছেদ হলে তাঁদের অনেক কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়। এখনো গ্রামের অনেক নারী, এমনকি শহরেও অনেকে বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’

আইনে অধিকার নির্ধারিত থাকলেই তার সুফল নিশ্চিত হয় না; সেই অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং বাস্তবায়নও জরুরি। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কুসংস্কার, বৈষম্য ও অনীহা দূর করতে হবে। পরিবারের মেয়ে বা বোনকে পর ভাবার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিটি পরিবারে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সম্পত্তি বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে নারীর বঞ্চনা অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি আইনগত অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো গেলে নারীরা নিজেদের প্রাপ্য বুঝে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও আত্মবিশ্বাসী হবেন। এতে পরিবার ও সমাজে ন্যায়বিচার, সমতা এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।

জ/দি


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত