আরেকটি বিপ্লবের ইঙ্গিত দিয়ে জনগণের দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের দাবিতে আয়োজিত আগের দুটি লংমার্চ সফল হয়েছে। এবারও দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৭টায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আরেকটি বিপ্লব আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। জনগণের দাবি আদায়ে আমরা কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় দাবি নিয়ে রাস্তায় নামিনি। এসব জনগণের দাবি। আমাদের আগের দুটি লংমার্চ জনগণের সহযোগিতায় সফল হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাত দফা দাবির মধ্যে মূল দাবি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন। এ দাবি আদায় হলে বাকি ছয়টি দাবি মাথাচাড়া দিত না। বিএনপি সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে এবং তাদের আশাহত করেছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করলে বিএনপিকে চড়া মূল্য দিতে হবে।’
১১ দলীয় ঐক্যের সাত দফা দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ।
জামায়াত আমির বলেন, ‘বিএনপি অতীত থেকে শিক্ষা নেয়নি। বরং নতুন নতুন জঞ্জাল সৃষ্টি করছে। অতীতে যারা দাসত্ব স্বীকার করেছে, তারা নিজেদের পরিণতি ভোগ করছে। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আপনারা আমাদের দাবি মেনে নিন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন করুন। আমাদের দাবি আদায় করে আমরা ছাড়ব।’
যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা কারও ছলনায় কান দিও না।’ একই সঙ্গে জনগণের দাবি আদায়ের আন্দোলনে লংমার্চ সফল করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, ‘আমরা চাই দেশটা ভালোভাবে চলুক। সিস্টেম ভালো না থাকলে দেশ ভালোভাবে চলতে পারে না।’ তাঁর অভিযোগ, সরকার ক্ষমতায় আসার পর জেলা, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন করপোরেশন বিএনপির কার্যালয়ে পরিণত হয়েছে। সেখান থেকে সব টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক বলেন, ‘আমরা জুলাই বিপ্লবের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট পুনর্ব্যক্ত করছি। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে আসছি। সরকার গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে গাদ্দারি করছে, জনগণকে অসম্মান করছে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, গণভোট অবৈধ হলে এ সরকার ও সংসদও বৈধ হতে পারে না। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, তেল-গ্যাস সংকটে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করায় দেশে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বেড়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘বিএনপি ভুল পথে পা বাড়িয়ে ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটছে। সংবিধান সংস্কার না করে সংবিধান সংশোধন কমিটি করে সরকার একদলীয় শাসনের পথে হাঁটছে। জুলাই সনদের সঙ্গে গাদ্দারি করে সরকার জনগণকে লাল কার্ড দেখিয়েছে।’
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ১১ দলের কর্মীদের আহত করারও নিন্দা জানান তিনি।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম ছোবহানী, জাগপা সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, এমপি মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম ও ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক সমাবেশ সঞ্চালনা করেন।
হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে সকাল ৮টার দিকে লংমার্চের বহর খুলনা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পদ্মা সেতু পার হয়ে শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবা, বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়, খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বর ও ফুলতলার বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লীর মোড় এবং ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে পথসভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বহরের।
লংমার্চের শেষ কর্মসূচি হিসেবে কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া যাত্রাপথের বিভিন্ন স্থানে গণজমায়েতের আয়োজন করা হয়েছে। এসব স্থানে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ অন্য নেতারা অনানুষ্ঠানিক বক্তব্য দেবেন। পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় ১১ দলের নেতাকর্মীরা লংমার্চের বহরকে অভ্যর্থনা জানাবেন।
উল্লেখ্য, দাবি আদায়ের লক্ষ্যে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লংমার্চ করে ১১ দল। দ্বিতীয় লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয় ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে।
জ/শা