তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড বাজার। বিশ্বের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম আচ্ছাদিত বাজারগুলোর অন্যতম এই বিপণিকেন্দ্র শুধু কেনাবেচার স্থান নয়, বরং শতাব্দীপ্রাচীন কারুশিল্প, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দক্ষতা হস্তান্তরের এক অনন্য কেন্দ্র। বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের কারিগরদের মধ্যে গড়ে ওঠা সহযোগিতা, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও ঐতিহ্যের বন্ধনই প্রায় ৫০০ বছর ধরে বাজারটিকে প্রাণবন্ত রেখেছে।
৭৮ বছর বয়সী উমিত বের্কসয়ের হাতে থাকা ম্যাগনিফাইং গ্লাসের নিচে ঝলমল করছিল একটি বড় চুনি পাথর। ইস্তাম্বুলের এই ঐতিহ্যবাহী বাজারের অভিজ্ঞ গয়না ব্যবসায়ী পাথরটি পরীক্ষা করতে করতে জানান, দীর্ঘদিন ধরে এটি তাঁর সিন্দুকে সংরক্ষিত ছিল। এত বড় ও নিখুঁত চুনি এখন সহজে পাওয়া যায় না। একটি আংটির জন্য পাথরটি একেবারেই উপযুক্ত।
এই চুনিকে ঘিরেই শুরু হয় নতুন এক কারুশিল্পের যাত্রা। গ্র্যান্ড বাজারের সরু গলি, ঐতিহাসিক ভবন ও ছোট ছোট কর্মশালার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যান বের্কসয়। তাঁর কাছে বাজারটির প্রকৃত সৌন্দর্য ঝলমলে দোকান কিংবা পর্যটকদের ভিড়ে নয়; বরং এর আড়ালে কাজ করে যাওয়া দক্ষ কারিগরদের হাতে গড়া শিল্পে।
১৪৫৩ সালে বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে কনস্টান্টিনোপল দখলের পর উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ গ্র্যান্ড বাজার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। নিজের প্রতিষ্ঠিত স্থাপনাগুলোর অর্থায়ন এবং বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে তিনি একটি বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাজারটি সম্প্রসারিত হয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ধাক্কাও সামলে এটি তুরস্কের ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উসমানীয় শিল্পকলার ইতিহাসবিদ মুস্তাফা জেজারের বর্ণনা অনুযায়ী, বাজারটির আঁকাবাঁকা গলিগুলো একসময় সামরিক ব্যারাকের মতো সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো ছিল। পরে বিভিন্ন পেশা ও কারুশিল্পের ভিত্তিতে গলিগুলোর আলাদা পরিচিতি গড়ে ওঠে।
বর্তমানে ৬৫টি সড়ক, ১৪টি ঐতিহ্যবাহী সরাইখানা এবং প্রায় ৩ হাজার ৬০০ দোকান নিয়ে বিস্তৃত গ্র্যান্ড বাজারে প্রবেশের জন্য রয়েছে ১১টি প্রধান ফটক। প্রতিদিন এখানে সর্বোচ্চ চার লাখ দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। তবে এই বিশাল আয়োজনের আড়ালে বাজারটির প্রকৃত প্রাণ হয়ে আছে ছোট ছোট কারখানা ও কর্মশালাগুলো।
গ্র্যান্ড বাজারের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তুরস্কের আর্মেনীয়, গ্রিক, ইহুদি ও সিরীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কারিগরদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা পাশাপাশি কাজ করেছেন, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছেন এবং নিজেদের দক্ষতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
বের্কসয়ের ভাষ্য, বাজারটির পুরু দেয়ালের আড়ালে এই কারুশিল্পের ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে। সময়ের সঙ্গে দোকানের পণ্য ও সাজসজ্জায় পরিবর্তন এলেও কারিগরি দক্ষতার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের চাহিদা এবং নতুন ফ্যাশনের সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন।
বাজারটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ চেভাহির বেদেসতেনি। ১৫টি গম্বুজবিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক স্থাপনাকে কেন্দ্র করেই বর্তমান বাজারের বিস্তার ঘটেছে। অর্থনীতির অধ্যাপক কেনান মরতানের উদ্ধৃত একটি প্রাচীন বাণী সেখানে ব্যবসার দর্শন তুলে ধরে। বাণীটির ভাবার্থ হলো, মুনাফা বুনো পাখির মতো বাতাসে উড়ে বেড়ায়; কৌশলে তাকে ধরতে পারলেই সমৃদ্ধি আসে।
বাজারের ১৮৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত আর্মেনীয় মালিকানাধীন ‘আপারাম’ দোকানে কাঁচা স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু বিক্রি হয়। এর কাছেই রয়েছে ‘এপোক’ নামের একটি প্রাচীন সামগ্রীর দোকান, যার ব্যবসার ইতিহাস ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত।
৭৬ বছর বয়সী গেভার্ট তেমিনিয়ান কৈশোরে এই দোকানে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তিনি তাঁর সাবেক শিক্ষানবিশ ইব্রাহিম হালিল ইয়িসারাচের সঙ্গে ব্যবসাটি পরিচালনা করছেন। তেমিনিয়ান জানান, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে অনেকেই মূল্যবান সামগ্রী বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করতে আসছেন। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি আশাবাদী।
অন্যদিকে, গয়না তৈরির কারিগর সেভান হারুনিয়ান প্রায় ৪৬ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। তাঁর কর্মশালায় বের্কসয়ের নকশা অনুযায়ী ১২ ক্যারেটের চুনিটি স্বর্ণের আংটিতে বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
সেভানের দুই ছেলে আরদা ও আরাস ছোটবেলা থেকেই বাবার কর্মশালায় কাজ শিখেছেন। ইস্তাম্বুলের মিমার সিনান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিষয়ে পড়াশোনা করা আরাস পারিবারিক ব্যবসায় কম্পিউটারভিত্তিক নকশা তৈরির প্রযুক্তি যুক্ত করেছেন। অন্যদিকে, তাঁর ভাই আরদা হাতে-কলমে কাজ শিখছেন।
সেভানের মতে, এই পেশা ও গুরু-শিষ্যভিত্তিক শিক্ষার ধারাকে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা হস্তান্তর করা গেলেই ঐতিহ্যের প্রকৃত মূল্য অক্ষুণ্ন থাকবে।
গ্র্যান্ড বাজারে গয়না এখনও সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক খাত। ২০১৭ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, বাজারের ভেতরে ৫৩২টি গয়নার দোকান ছিল। এসব স্বর্ণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসাকে সেবা দিতে কাজ করতেন ৫৭ জন দক্ষ কারিগর।
এমনই একজন ৬৬ বছর বয়সী হ্রান্ত জোরবাস। পাথর বসানোর কাজে বিশেষজ্ঞ এই কারিগর বের্কসয়ের নকশা অনুযায়ী সেভানের তৈরি আংটিতে চুনিটি বসানোর দায়িত্ব নেন। তাঁর ছেলে শান্ট আধুনিক জুয়েলার্স মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করলেও জোরবাস এখনও নিজের চোখে পাথরের ফাটল, ত্রুটি এবং বসানোর সূক্ষ্ম চিহ্ন পরীক্ষা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
শান্টের মতে, মানুষের জীবনযাপন ও বিলাসপণ্য সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাওয়ায় গয়নার ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। তারপরও হাতে তৈরি গয়নার মূল্য বোঝেন-এমন ক্রেতা এখনও রয়েছেন।
আংটিতে নিখুঁতভাবে বসানো চুনিটি দেখে মুগ্ধ হন বের্কসয়। তাঁর প্রশ্ন, কারখানায় তৈরি কোনো আংটি কি এই সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে?
বের্কসয়ের এই কথাতেই যেন উঠে আসে গ্র্যান্ড বাজারের টিকে থাকার রহস্য। আধুনিক বিপণিকেন্দ্রের বিস্তার এবং সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও পারস্পরিক বিশ্বাস, দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, কারিগরি দক্ষতা ও প্রজন্মান্তরে শিল্পকৌশল হস্তান্তরের ঐতিহ্যই প্রায় পাঁচ শতাব্দী ধরে এই ঐতিহাসিক বাজারকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সূত্র: সিএনএন
জ/উ