বিছানায় ঘুমানোর সময় এপাশ-ওপাশ করতে গিয়ে নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনা মানুষের জন্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পাখিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ ভিন্ন। গাছের সরু ডালে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুমালেও বেশিরভাগ সময় তাদের নিচে পড়ে যেতে দেখা যায় না। এমনকি ঝড়ো বাতাসে ডাল দুললেও তারা কীভাবে ভারসাম্য ধরে রাখে, তার পেছনে রয়েছে পায়ের বিশেষ গঠন ও শরীরের প্রাকৃতিক এক ‘লকিং সিস্টেম’।
বিশেষ করে ‘পার্চিং বার্ড’ বা প্যাসারিন গোত্রের পাখিদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করে। পাখির শরীরের ওজনই এ ক্ষেত্রে ডাল আঁকড়ে ধরার শক্তি তৈরি করে।
ছোট পাখিদের পায়ে সাধারণত সামনে তিনটি এবং পেছনে একটি আঙুল থাকে। পেছনের বিশেষ আঙুলটির নাম ‘হ্যালুক্স’। পাখি যখন গাছের ডালে বসে, তখন শরীরের ওজনের প্রভাবে পায়ের জোড়াগুলো এমনভাবে বাঁকতে থাকে, যাতে পায়ের টেন্ডনে টান সৃষ্টি হয়।
এই টানের কারণে পায়ের আঙুলগুলো স্বাভাবিকভাবেই ডালকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। ফলে ঘুমের মধ্যেও ডাল ধরে রাখার জন্য পাখিকে আলাদাভাবে পেশিশক্তি ব্যয় করতে হয় না। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেকটা স্বয়ংক্রিয় লকের মতো কাজ করে। বিজ্ঞানীরা এই ব্যবস্থাকে ‘অটোমেটিক পার্চিং মেকানিজম’ বলে থাকেন।
দুলন্ত ডালেও ভারসাম্য কীভাবে?
বাতাসে গাছের ডাল দুলবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে ডালের এই নড়াচড়ার সঙ্গে পাখির শরীরও ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম। পাখির হাড়, পেশি ও টেন্ডন একসঙ্গে এমনভাবে কাজ করে যে ছোটখাটো বাতাস বা ডালের দোলনের সঙ্গে তারা নিজেদের সহজেই মানিয়ে নিতে পারে।
২০১৯ সালে ম্যান্ডারিন ডায়মন্ডবার্ডের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় তৈরি ডিজিটাল মডেলেও পাখির এই শারীরিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এতে পায়ের গঠন ও শরীরের বিভিন্ন অংশ কীভাবে পাখিকে ডালের ওপর স্থির থাকতে সহায়তা করে, তার একটি ধারণা পাওয়া যায়।
সব পাখির কৌশল এক নয়
তবে সব পাখি একই পদ্ধতিতে ডালে বসে ঘুমায় বা বিশ্রাম নেয় না। প্রজাতিভেদে পায়ের গঠন এবং বসার কৌশলেও পার্থক্য রয়েছে। কাঠঠোকরা ও টিয়াপাখির পায়ের গঠন অনেক পাখির তুলনায় আলাদা। তাই ডাল বা অন্য কোনো পৃষ্ঠ আঁকড়ে ধরার কৌশলও তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন।
আবার বক বা ফ্লেমিংগোর মতো কিছু পাখিকে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। ইউরোপীয় স্টার্লিংয়ের মতো কিছু পাখি সব সময় ডাল শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখে না। বরং তাদের পায়ের অবস্থান ও শরীরের ভারসাম্য এমনভাবে কাজ করে যে তারা সহজেই স্থির থাকতে পারে।
শীতের সময়ও অনেক পাখি শরীরের তাপ ধরে রাখতে বিশেষ কিছু কৌশল ব্যবহার করে। এ সময় একটি পা শরীরের কাছে গুটিয়ে রাখা এবং মাথা পালকের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখার মতো আচরণ তাদের মধ্যে দেখা যায়।
অর্থাৎ, মানুষের মতো আরামদায়ক বিছানা বা নরম বালিশ ছাড়াই পাখিরা যে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে, তার পেছনে রয়েছে প্রকৃতির অসাধারণ শারীরিক ব্যবস্থা। পাখির পায়ের এই স্বয়ংক্রিয় গ্রিপ অনেকটা প্রাকৃতিক লকের মতো কাজ করে। তাই ঘুমের মধ্যেও ডাল থেকে হঠাৎ নিচে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাদের থাকে না।
জ/উ