পাহাড়-পর্বত, দুর্গম উপত্যকা কিংবা ব্যস্ত শহরের ভিড়-কোনোটিই মানুষের রেলপথ নির্মাণের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে থামাতে পারেনি। কঠিন ভূপ্রকৃতিতে যাতায়াত সহজ করতে প্রকৌশলীরা তৈরি করেছেন নানা ধরনের ব্যতিক্রমী রেলব্যবস্থা। কোথাও ট্রেন চলছে সৌরশক্তিতে, কোথাও আবার রেললাইনে ছুটছে বাসের আদলে তৈরি যান। এমনকি শহরের ওপর ঝুলে চলা ট্রেনও রয়েছে। ভ্রমণ লেখক অ্যাড্রিয়ান ব্রিজের এক প্রতিবেদনে বিশ্বের এমন ১০টি ব্যতিক্রমী ট্রেনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সৌরশক্তির ট্রেন
দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনায় চালু হওয়া ‘ট্রেন সোলার দে লা কেব্রাদা’ ইতোমধ্যে ব্যতিক্রমী ট্রেন হিসেবে আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া সৌরশক্তিচালিত এই ট্রেনটি দেশটির ঐতিহ্যবাহী কেব্রাদা দে হুমাহুয়াকা অঞ্চলে চলাচল করে।
আন্দিজ পর্বতমালার ২৬ মাইল দীর্ঘ পথের বিভিন্ন স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়কে যুক্ত করেছে দুই বগির এই ট্রেন। এতে রয়েছে লিথিয়াম ব্যাটারি, যা সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ চার্জ করা হয়। ধীরগতির পরিবেশবান্ধব এই যাত্রায় পর্যটকদের জন্য রাতে তারা দেখার পাশাপাশি ওয়াইন আস্বাদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। টিকিটের মূল্য ৪৫ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৪ পাউন্ড।
রেললাইনে ছুটছে বাস
চিলি, বলিভিয়া ও কলম্বিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায় ‘গন্ডোলা কারিল ফেরোবাস’। পুরোনো বাসের বডি ব্যবহার করে তৈরি এসব যানকে রেলপথে চলার উপযোগী করতে সাধারণ চাকার পরিবর্তে লাগানো হয়েছে ট্রেনের লোহার চাকা।
দেখতে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের মাধ্যম। চিলির সান্টিয়াগোর কিছুটা উত্তরে পর্যটকদের জন্য ২১ মাইল দীর্ঘ পথে বিশেষ ‘গন্ডোলা কারিল’ সার্ভিস চালু রয়েছে। এর যাতায়াত ভাড়া ৫০ হাজার চিলিয়ান পেসো বা ৩৯ পাউন্ড।
রাস্তা ও রেল-দুই পথেই চলে
প্রযুক্তিগত দিক থেকে জাপানের ‘ডিএমভি’ বা ডুয়াল-মোড ভেহিক্যালও বেশ অভিনব। একই যান সাধারণ সড়ক এবং রেললাইন-দুই পথেই চলতে পারে।
শিকোকু দ্বীপের আসা কোস্ট রেলওয়ে পরিচালিত এই যানটি দূরবর্তী উপকূলীয় শহরের ৩০ মাইল পথ পাড়ি দেয়। এর মধ্যে ছয় মাইল পথ রেললাইনে চলতে হয়। সড়ক থেকে রেললাইনে ওঠার সময় মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে সামনের রাবারের চাকা ওপরে উঠে যায় এবং স্টিলের চাকা নিচে নেমে আসে।
এই যানে ভ্রমণের টিকিটের দাম ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ জাপানি ইয়েন বা ১ থেকে ১১.৫০ পাউন্ড।
পিকাতচুর রঙে ‘পোকেমন’ ট্রেন
প্রযুক্তির পাশাপাশি বিনোদন ও সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছে জাপানের ‘পোকেমন উইথ ইউ ট্রেন’-এ। জনপ্রিয় অ্যানিমে চরিত্র ‘পিকাতচু’র হলুদ রঙে ট্রেনটির ভেতর ও বাইরের সাজসজ্জা করা হয়েছে। মেঝে, দেয়াল ও পর্দাসহ পুরো ট্রেনেই রয়েছে পিকাতচুর উপস্থিতি।
শিশুদের বিনোদনের জন্য ট্রেনের ভেতরে আলাদা প্লে-রুমও রয়েছে। তোহোকু অঞ্চলে চলাচলকারী এই ট্রেনের প্রায় দুই ঘণ্টার যাত্রায় টিকিটের মূল্য ১ হাজার ৭০০ জাপানি ইয়েন বা ৮ পাউন্ড।
শহরের ওপর ঝুলে চলে ‘উড়ন্ত ট্রেন’
জার্মানির ‘ভুহুফাল্টার শ্বেবেবান’ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত ঝুলন্ত ট্রেন। উত্তর রাইন-ওয়েস্টফেলিয়ার ভুপারটাল শহরে চলাচলকারী এই ঝুলন্ত মনোরেলটি শহরের ওপর দিয়ে প্রায় আট মাইল পথ অতিক্রম করে।
দেখতে অনেকটা সায়েন্স-ফিকশন সিনেমার দৃশ্যের মতো হলেও এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯০১ সালে। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা এই ট্রেনটি বর্তমানে শহরের গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের মাধ্যমের পাশাপাশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। ২৪ ঘণ্টার টিকিটের মূল্য ৭.৬০ ইউরো বা ৬.৫০ পাউন্ড।
কাচের মেঝের ঝুলন্ত ট্রেন
জার্মানির এই প্রযুক্তি অনুসরণ করে চীনও তৈরি করেছে নিজস্ব ঝুলন্ত মনোরেল ‘অপটিক্স ভ্যালি ফোটন’ বা ‘স্কাইরেল’। হুপেই প্রদেশের উহান শহরে চালু থাকা এই ট্রেনের বিশেষত্ব হলো এর মেঝে প্রায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ কাচের মতো। ফলে যাত্রীরা চলন্ত অবস্থায় নিচের শহরের দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।
ড্রাইভারবিহীন এই মনোরেলের একমুখী ভ্রমণের ভাড়া ৩০ চীনা ইউয়ান বা ৩.৪০ পাউন্ড। এ ছাড়া চীনের ছেংতুতেও সম্প্রতি একই ধরনের আরেকটি ঝুলন্ত ট্রেন চালু করা হয়েছে।
বিশ্বরেকর্ডের খাড়া পথে সুইস ট্রেন
পাহাড়ি পথে ওঠার ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের ‘শ্বিজ-স্টুস ফিউনিকুলার’ প্রকৌশলের এক অনন্য উদাহরণ। এর বগিগুলোর নকশা দেখতে অনেকটা বিয়ারের পিপা বা ব্যারেলের মতো।
ট্রেনটি সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ ঢালু পথে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ ফুট উচ্চতায় উঠে বিশ্বরেকর্ড করেছে। খাড়া পথে ওঠার সময় বগিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘুরে যায়। ফলে ঢাল যতই খাড়া হোক, যাত্রীরা ট্রেনের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে সোজা অবস্থায় থাকতে পারেন।
স্টুস নামের বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকার মানুষের যাতায়াতের এই ব্যবস্থার রাউন্ড ট্রিপ টিকিটের মূল্য ২৩.২০ সুইস ফ্রাঙ্ক বা ২১ পাউন্ড।
পাহাড়ে জিগজ্যাগ পথে ‘ডেভিলস নোস’
ইকুয়েডরের ‘ডেভিলস নোস’ বা ‘নারিজ দেল দিয়াবলো’ রেলপথও প্রকৌশলের এক ব্যতিক্রমী নিদর্শন। ভয়াবহ এক ধসের পর আবার চালু হওয়া এই রেলপথে আলৌসি ও সিমবাম্বের মধ্যবর্তী খাড়া পাহাড় অতিক্রম করতে বিশেষ জিগজ্যাগ রুট ব্যবহার করা হয়।
মাত্র সাত মাইল পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রেনটি ১ হাজার ৬৪০ ফুটের বেশি উচ্চতায় ওঠে। এ সময় কখনো সামনে আবার কখনো পেছনের দিকে চলতে চলতে খাড়া পাহাড় অতিক্রম করে ট্রেনটি। রোমাঞ্চকর এই রাউন্ড ট্রিপের ভাড়া ৩০ মার্কিন ডলার বা ২২.৫০ পাউন্ড।
কম্বোডিয়ার ‘বাঁশের ট্রেন’
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন ব্যবহার করে স্থানীয়রা নিজেদের প্রয়োজনেই তৈরি করেছিলেন ‘বাঁশের ট্রেন’ বা ‘নরি’। কাঠের ফ্রেম, বাতিল লোহা ও বাঁশের পাতাতন দিয়ে তৈরি এই প্ল্যাটফর্ম চালাতে ব্যবহার করা হয় মোটরবাইক, ঘাস কাটার যন্ত্র কিংবা ট্রাক্টরের ইঞ্জিন।
ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩০ মাইল গতিতে চলতে পারে এই বাহন। এতে একসঙ্গে চারজন যাত্রী বসতে পারেন। ব্যাটামবাং প্রদেশের ও দামবং গ্রাম থেকে শুরু হওয়া তিন মাইলের এই যাত্রার ভাড়া মাত্র ৫ মার্কিন ডলার বা ৪ পাউন্ড।
‘কোথাও না-যাওয়া’ ট্রেন
তালিকার শেষের ট্রেনটি অস্ট্রেলিয়ার ‘গলফল্যান্ডার’। রসিকতা করে একে ‘কোথাও না-যাওয়া ট্রেন’ বলা হয়। কুইন্সল্যান্ডের আউটব্যাক অঞ্চলে নরম্যানটন ও ক্রয়ডন শহরের মধ্যে ৯৪ মাইল দীর্ঘ একক রেলপথে এটি চলাচল করে।
উনিশ শতকে স্বর্ণের সন্ধান পাওয়ার গুজবকে কেন্দ্র করে এই রেলপথ তৈরি করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেখানে কোনো খনির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে মূল রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন এই পথে বর্তমানে ‘টিন হেয়ার’ নামের বাসের মতো দেখতে একটি ট্রেন চলাচল করে।
কুমিরসংকুল জলাভূমির মধ্য দিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার এই যাত্রা এখন রেলপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
জ/উ