সরকারি দপ্তরে টাকা ছাড়া কাজ হয় না- এমন অভিজ্ঞতা দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ সেবাপ্রার্থীর! নাগরিকের প্রাপ্য সেবা পেতেও গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা, পোহাতে হচ্ছে হয়রানি। অথচ একটি পরিবারের মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানোর পর উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা। অর্থাৎ, পকেটে টাকা নেই, তবু সেবা পেতে বাড়তি অর্থের চাপ; তার ওপর দপ্তরে দপ্তরে ঘোরার ভোগান্তি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও হয়রানির কাঠামো না বদলানোর এই চিত্র সরকারি সেবা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সরকারি দপ্তরে কাজ করাতে গেলে টাকা দিতে হয়- এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ সেবাপ্রার্থী। অথচ দেশের একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান মাত্র ৭০ টাকা। অর্থাৎ, মাসজুড়ে হিসাব মেলানোর পর হাতে থাকে সামান্য অর্থ। এর মধ্যে সরকারি সেবা পেতে বাড়তি টাকা দিতে হলে সেই পরিবারকে পড়তে হয় আরও চাপে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানির কাঠামো বদলায়নি বলে উঠে এসেছে এক জাতীয় গবেষণায়।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) গবেষণায় বলা হয়েছে, সরকারি সেবা পেতে হয়রানি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। সমস্যা শুধু ঘুষ বা অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ে সীমাবদ্ধ নয়; নিয়মকানুন নিয়ে বিভ্রান্তি, অযথা বাধা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে ভোগান্তিও এর অন্তর্ভুক্ত। গবেষণায় এই হয়রানিকে একধরনের ‘অনানুষ্ঠানিক কর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যা মানুষের আর্থিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ক্ষয় করছে।
‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে গত ২০২৫ সালের ৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও হয়রানির প্রচলিত কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে হয়রানিকে ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাধি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তাঁর ভাষ্য, অন্য দেশের মানুষ দুর্নীতি বোঝে, হয়রানি বোঝে না।
ঘুষের কারণে সরাসরি অর্থ হারাতে হয়। অন্যদিকে অযথা ঘোরানো, দীর্ঘসূত্রতা ও সেবা পেতে বাধার কারণে নষ্ট হয় সময় ও কর্মঘণ্টা। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষের ক্ষেত্রে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে গিয়ে কাজ হারানোও আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। মাস শেষে গড়ে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা। ফলে হঠাৎ অসুস্থতা, সন্তানের শিক্ষাব্যয় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশই চলে যায় খাবারের পেছনে। গ্রামীণ পরিবারে এ হার ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সবচেয়ে নিম্ন আয়ের ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা, অথচ ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। অর্থাৎ, প্রতি মাসে আয়কে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ব্যয়।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারি সেবা পেতে বাড়তি অর্থ দিতে হলে খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজনের জন্য বরাদ্দ অর্থেও টান পড়ে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা অনেক পরিবারও ঋণ, অসুস্থতা, মূল্যস্ফীতি, অপ্রতুল কর্মসংস্থান ও হয়রানির চাপে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
হয়রানির প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়; ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আলোচনায় উঠে এসেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হয়রানির কারণে অনেক রপ্তানিকারক রপ্তানি করাই ছেড়ে দেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোও হয়রানির শিকার হচ্ছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে যে বৈষম্য দূর করার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, নীতিনির্ধারকেরা তা অর্থবহ করতে পারছেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও এনবিআরের সংস্কার কেন হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
একশনএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, দুর্নীতি ও হয়রানিকে স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা দিয়ে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। বাজারে বসতে গেলেও এক পক্ষ আরেক পক্ষকে সরিয়ে দিয়ে টাকা দাবি করছে বলে উদাহরণ দেন তিনি।
গবেষণার তথ্য সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। হয়রানি কমাতে সেবার নিয়ম ও ফি স্পষ্ট করা, নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে কি না, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হলো- একজন নাগরিক কত সহজে, কত কম সময়ে এবং বাড়তি অর্থ না দিয়ে নিজের প্রাপ্য সেবা পাচ্ছেন। মাস শেষে যেখানে একটি পরিবারের উদ্বৃত্ত মাত্র ৭০ টাকা, সেখানে সেবা পেতে অতিরিক্ত অর্থের দাবি তার জন্য আরেকটি আর্থিক আঘাত।
জ/বা