বুড়িগঙ্গার তীরে ইতিহাসের সাক্ষী আহসান মঞ্জিল

ফিচার ডেস্ক

ফিচার

2026-09-30T21:53:08+06:00
2026-09-30T21:53:08+06:00
বুধবার ● ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
Advertisement
ফিচার
বুড়িগঙ্গার তীরে ইতিহাসের সাক্ষী আহসান মঞ্জিল
ফিচার ডেস্ক
⏲ ৯:৫৩ পিএম | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবার
সংগৃহীত ছবি
বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাপি রঙের অনন্য প্রাসাদ আহসান মঞ্জিল। পুরান ঢাকার কোলাহল, সরু গলি আর ঐতিহ্যবাহী খাবারের ঘ্রাণের মধ্যে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটি। শুধু একটি ঐতিহাসিক ভবন নয়, আহসান মঞ্জিল বাংলার মুসলিম রেনেসাঁ, নবাবি আভিজাত্য ও অতীতের নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত একটি স্থাপনা।

প্রাসাদের ভেতরে যা আছে
আহসান মঞ্জিল মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। পূর্ব অংশের সুবিশাল গম্বুজবিশিষ্ট ভবনটি ‘রংমহল’ এবং পশ্চিম অংশটি ‘অন্দরমহল’ নামে পরিচিত। বর্তমানে পুরো প্রাসাদকে ২৩টি গ্যালারিতে ভাগ করে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অধীনে জাদুঘর হিসেবে পরিচালনা করা হচ্ছে।

প্রাসাদে প্রবেশ করলেই দেখা মেলে রাজকীয় ‘দরবার হলের’। তৎকালীন সময়ে এখানেই রাজকার্যের গুরুত্বপূর্ণ নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো। এ ছাড়া নবাবদের বিনোদনের জন্য ছিল ‘জলসা ঘর’, ‘নাচঘর’ ও সুবিশাল ‘বিলিয়ার্ড রুম’।

নবাব পরিবারের জীবনযাপন ও আভিজাত্যের স্মারক হিসেবে জাদুঘরে রয়েছে হাতির দাঁতের তৈরি বিভিন্ন শিল্পকর্ম, রাজকীয় অস্ত্রাগার, কারুকার্যময় বিশাল কাঠের সিঁড়ি, ঝাড়বাতি এবং নবাব পরিবারের ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও তৈজসপত্র। রয়েছে ইতিহাসসমৃদ্ধ চিত্রশালা ও লাইব্রেরিও।

গম্বুজ ও ঐতিহাসিক দরবার
আহসান মঞ্জিলের অন্যতম আকর্ষণ এর কেন্দ্রস্থলের বিশাল উঁচু গম্বুজ। গম্বুজের নিচেই রয়েছে দোতলায় ওঠার আঁকাবাঁকা কাঠের রাজকীয় সিঁড়ি। আর রংমহলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক দরবার হল।

তৎকালীন পূর্ববাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই দরবার হল। ১৯০৬ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ গঠনের প্রাথমিক রূপরেখা ও বৈঠকের সঙ্গে আহসান মঞ্জিলের আঙিনার গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা ছিল।

অন্দরমহল ও নাচঘর
প্রাসাদের পশ্চিম অংশের অন্দরমহল ছিল নবাব পরিবারের নারী ও সদস্যদের বসবাসের জায়গা। বর্তমানে সেখানে তাঁদের ব্যবহৃত পোশাক, অলংকার ও বিভিন্ন প্রাত্যহিক সামগ্রী প্রদর্শন করা হয়েছে।

অন্দরমহলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জলসা ঘর ও নাচঘর। দেশ-বিদেশের অতিথিদের আপ্যায়ন এবং সংগীত ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের আসর বসত এসব স্থানে। এর পাশেই রয়েছে রাজকীয় ডাইনিং রুম এবং অতিথিদের জন্য নির্মিত বিশ্রামাগার।

স্থাপত্যে মুঘল ও ইউরোপীয় প্রভাব
আহসান মঞ্জিলের স্থাপত্যশৈলী দর্শনার্থীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। ইন্দো-সারাসেনিক বা আধুনিক ইউরোপীয় স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ভারতীয় মুঘল স্থাপত্যের সংমিশ্রণে এ প্রাসাদের নির্মাণশৈলী গড়ে উঠেছে।

১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে ২০ শতকের শুরু পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ভারতীয় মুঘল ও ইউরোপীয় গথিক-রেনেসাঁ স্থাপত্যের সমন্বয় দেখা যায়। এই সম্মিলিত ধারাকেই ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপত্যরীতি বলা হয়।

দূর থেকেই চোখে পড়ে আহসান মঞ্জিলের বিশাল গম্বুজ। দোতলা ভবনের দরবার হল, জলসা ঘর, রংমহল, লাইব্রেরি ও কাঠের বিশাল সিঁড়ি এর রাজকীয় বৈভবের পরিচয় বহন করে। সামনে সবুজ বাগান আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা বুড়িগঙ্গা পুরো স্থাপনাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য।

পুরান ঢাকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে আছে
আহসান মঞ্জিলকে পুরান ঢাকার সামগ্রিক ঐতিহ্য থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন। প্রাসাদটির আশপাশেই গড়ে উঠেছে পুরান ঢাকার স্বতন্ত্র ভাষা, বাকরখানি, কাচ্চি বিরিয়ানি ও আতরের গলির সংস্কৃতি।

নবাবদের সময় থেকে পুরান ঢাকায় গড়ে ওঠা নানা উৎসবমুখর ঐতিহ্যের অনেকটাই এখনো টিকে আছে। সাকরাইনে ঘুড়ি ওড়ানো কিংবা মহররমের তাজিয়া মিছিল-এসব আয়োজন পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে।

ব্রিটিশদের সঙ্গে নবাব পরিবারের সম্পর্ক
ঢাকার নবাব পরিবারের সঙ্গে তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ ও কৌশলগত। নবাব পরিবারের বিভিন্ন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার খাজা আবদুল গনি ও খাজা আহসানউল্লাহকে ‘নবাব’ ও ‘কেসিএসআই’ উপাধিতে ভূষিত করে।

লর্ড কার্জন, লর্ড নর্থব্রুকসহ ব্রিটিশ আমলের বিভিন্ন ভাইসরয় ও গভর্নর ঢাকায় এলে আহসান মঞ্জিলে অতিথি হিসেবে অবস্থান করতেন।

ঢাকার আধুনিকায়নের বিভিন্ন উদ্যোগেও নবাব পরিবারের ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। ঢাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সংযোগ আনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নবাব সলিমুল্লাহর ভূমিকার সঙ্গে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রশাসনের সম্পর্কও আলোচনায় আসে।

এখনো দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ
বর্তমানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শনার্থী প্রতিদিন পুরান ঢাকার এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ দেখতে আসেন। বিশেষ করে ছুটির দিনে বুড়িগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে।

আহসান মঞ্জিল জাদুঘর প্রতি বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে। রোববার থেকে বুধবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। দেশি দর্শনার্থীদের প্রবেশ টিকিটের মূল্য ৪০ টাকা এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৫০০ টাকা। শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়।

নগরায়নের চাপে বদলে যাওয়া ঢাকার মধ্যে আহসান মঞ্জিল আজও অতীতের শিকড় ও ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই গোলাপি প্রাসাদে মিশে আছে নবাবি আমলের জাঁকজমক, পুরান ঢাকার সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের নানা অধ্যায়।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্য সংরক্ষণে আহসান মঞ্জিলের রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি এর আশপাশের পরিবেশও সুসংগঠিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই স্থাপনার মাধ্যমে ঢাকার সমৃদ্ধ অতীত ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে আরও কাছ থেকে জানার সুযোগ পাবে।

জ/উ



Advertisement
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত