ফুটবল মাঠে লিওনেল মেসির বাঁ পায়ের জাদুতে মুগ্ধ কোটি কোটি মানুষ। গোল, শিরোপা, রেকর্ড আর শান্ত স্বভাব-সব মিলিয়ে তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রীড়া তারকা। তার জনপ্রিয়তার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই জড়িয়ে আছে অসংখ্য ভক্তের ভালোবাসা। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনের গল্পে মেসির পথটা বরাবরই ছিল একটু আলাদা।
বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষের ‘ক্রাশ’ হয়েও মেসি শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছেন সেই মানুষটিকেই, যাকে তিনি চিনতেন খ্যাতির অনেক আগে থেকেই-আন্তোনেলা রোকুজ্জো।
গল্পের শুরু রোসারিওতে
মেসি ও আন্তোনেলার সম্পর্কের শুরু আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে। ছোটবেলাতেই তাদের পরিচয় হয়। আন্তোনেলা ছিলেন মেসির বন্ধু লুকাস স্কাগলিয়ার কাজিন। সেই সূত্রেই দুজনের মধ্যে পরিচয় তৈরি হয়।
তখন অবশ্য কেউ ভাবেনি, শৈশবের এই পরিচয় একদিন বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ফুটবল-প্রেমের গল্পে পরিণত হবে।
মেসির শৈশবের বড় অংশজুড়েই ছিল ফুটবল। মাত্র চার বছর বয়সে বল পায়ে নেওয়া শুরু করেন তিনি। রোসারিওর রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফুটবল খেলেই কাটত সময়। পরে তিনি নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের বয়সভিত্তিক দলে খেলেন।
তবে ১৩ বছর বয়সে তার জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। ফুটবলের স্বপ্ন পূরণে তাকে আর্জেন্টিনা ছেড়ে স্পেনে যেতে হয়। সেখানে যোগ দেন বার্সেলোনার বিখ্যাত ফুটবল একাডেমি লা মাসিয়ায়।
নতুন দেশে নতুন জীবন শুরু করতে গিয়ে মেসিকে ছেড়ে আসতে হয় রোসারিও, পরিবার ও শৈশবের বন্ধুদের। পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিকবার জানিয়েছেন, ছোটবেলার সেই সময় ও রোসারিওর বন্ধুদের স্মৃতি তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
দূরত্বেও কমেনি সম্পর্ক
মেসি স্পেনে গিয়ে নিজের ফুটবল ক্যারিয়ার গড়ে তুললেও আন্তোনেলার সঙ্গে তার পরিচয়ের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। সময়ের সঙ্গে দুজনের জীবন ভিন্ন পথে এগোলেও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি।
২০০৫ সালে আন্তোনেলার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু মারা গেলে তাকে শেষ বিদায় জানাতে রোসারিও ফিরে যান মেসি। ওই সময়ই আবার আন্তোনেলার সঙ্গে তার দেখা হয়। এরপর তাদের সম্পর্ক নতুন দিকে মোড় নেয় এবং ধীরে ধীরে দুজনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।
শৈশবের পরিচয় একসময় পরিণত হয় গভীর ভালোবাসায়। অন্যদিকে মেসিও তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছেন। তার নামের পাশে যোগ হচ্ছে একের পর এক গোল, শিরোপা ও ব্যক্তিগত পুরস্কার। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বেছে নেন এমন একজনকে, যিনি তাকে বিশ্বখ্যাত তারকা হওয়ার বহু আগ থেকেই চিনতেন।
তারকা মেসি, আন্তোনেলার কাছে সেই পুরোনো লিও
মেসির খ্যাতি যত বেড়েছে, তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও মানুষের আগ্রহ তত বাড়িয়েছে। তবে আন্তোনেলার সঙ্গে তার সম্পর্কের বিশেষত্ব হলো-এটি মেসির তারকা হয়ে ওঠার পর শুরু হয়নি। বরং বিশ্বজোড়া খ্যাতির অনেক আগেই তাদের পরিচয়।
২০১৭ সালে রোসারিওতেই জমকালো আয়োজনে বিয়ে করেন মেসি ও আন্তোনেলা। শৈশবের শহরেই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক রূপ দেন তারা। বিয়ের অনুষ্ঠানে মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারের বহু পরিচিত মুখও উপস্থিত ছিলেন।
বিয়ের আগেই তিন সন্তানের বাবা-মা
বিয়ের আগেই মেসি-আন্তোনেলার সংসারে আসে তিন সন্তান। ২০১২ সালে জন্ম নেয় তাদের প্রথম ছেলে থিয়াগো। এরপর ২০১৫ সালে আসে মাতেও এবং ২০১৮ সালে জন্ম নেয় ছোট ছেলে চিরো।
সন্তানদের জন্মের পর জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন মেসি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিন সন্তান তাকে মানুষ হিসেবে পরিণত হতে এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে সাহায্য করেছে।
স্ত্রী আন্তোনেলার প্রশংসাও বিভিন্ন সময়ে করেছেন মেসি। তার বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব এবং প্রতিদিনের নানা পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার দক্ষতা তাকে মুগ্ধ করে বলে জানিয়েছেন এই ফুটবল তারকা। স্ত্রীকে শুধু জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়, একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবেও যে তিনি সম্মান করেন, তার কথাতেই সেটি স্পষ্ট।
খ্যাতির মাঝেও পরিবারের গুরুত্ব
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ফুটবলার হয়েও মেসি বারবার বলেছেন, তার কাছে পরিবারের গুরুত্ব অনেক বেশি। ২০২১ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যাওয়া, তাদের নিয়ে আসা কিংবা ফুটবল অনুশীলনে পৌঁছে দেওয়া—এসব কাজ তিনি উপভোগ করেন।
বার্সেলোনায় থাকার সময়ও মেসি জানিয়েছিলেন, পরিবারের প্রয়োজনকে অনেক সময় নিজের ইচ্ছার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতে হয়। সন্তানদের বন্ধুত্ব ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিয়েও তিনি সচেতন ছিলেন।
ক্যারিয়ারের কঠিন সময়গুলোতেও পরিবারের সমর্থন মেসিকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে সাহায্য করেছে। স্ত্রী ও সন্তানদের কাছেই তিনি কঠিন মুহূর্তে আশ্রয় পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সম্পর্কের উষ্ণতা
মেসি ও আন্তোনেলার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ছবি ও পোস্টে তাদের পারিবারিক বন্ধনের উষ্ণতা ফুটে ওঠে। ছুটি কাটানো, জন্মদিন উদযাপন, ম্যাচের পর আনন্দ কিংবা সন্তানদের সঙ্গে পারিবারিক সময়-বিভিন্ন মুহূর্তে তাদের একসঙ্গে দেখা যায়।
তবে তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক সম্ভবত সামাজিক মাধ্যমে প্রদর্শন নয়; বরং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া।
আন্তোনেলাও নিজের পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত। তিনি শুধু ‘মেসির স্ত্রী’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নন; ব্যবসা ও ফ্যাশনজগতেও নিজের কাজ রয়েছে। অন্যদিকে মেসি প্রকাশ্যে বিভিন্ন সময়ে তার বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।
কোটি মানুষের ‘ক্রাশ’, মেসির কাছে একজনই
মেসিকে ঘিরে বিশ্বের কোটি মানুষের আগ্রহ। মাঠে তার খেলা দেখতে দর্শকদের অপেক্ষা, তার জার্সি পরা কিংবা হাতে তার নাম লেখা পোস্টার নিয়ে গ্যালারিতে দাঁড়ানো-সবই তার জনপ্রিয়তার প্রমাণ।
কিন্তু এত খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসার মাঝেও মেসির ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী সম্পর্কটি সেই রোসারিও শহরের আন্তোনেলার সঙ্গেই।
শৈশবের পরিচয়, দীর্ঘ দূরত্ব, পুনর্মিলন, ভালোবাসা, বিয়ে ও তিন সন্তান-সব মিলিয়ে মেসি-আন্তোনেলার গল্প যেন মনে করিয়ে দেয়, খ্যাতি একজন মানুষের চারপাশে অসংখ্য নতুন মানুষ এনে দিতে পারে। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি কখনো কখনো সেই মানুষই হন, যিনি আপনাকে চিনেছিলেন তখন, যখন আপনাকে চিনত না পুরো পৃথিবী।
মেসির ফুটবল-জাদু হয়তো একদিন থেমে যাবে। মাঠ মাতাবেন নতুন তারকারা। কিন্তু আন্তোনেলার সঙ্গে তার দীর্ঘ পথচলা থেকে যাবে মেসির জীবনের অন্যতম মানবিক অধ্যায় হিসেবে-বিশ্বের সবার প্রিয় তারকা হয়েও নিজের জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকে বেছে নেওয়ার এক অনন্য গল্প।
জ/উ