নেত্রকোণা শহরের কুরপাড় এলাকার তরুণী সোমাইয়া আক্তার মিতুর জীবন আজ সংগ্রাম, সাহস এবং স্বপ্নের এক অনন্য গল্প। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের পর আহত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন থাকলেও তিনি এখনও একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে আছেন।
প্রয়াত মোফাজ্জল হোসেন ও রেহেনা খানমের সন্তান মিতু ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবা করার স্বপ্ন দেখতেন। চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা পূরণ না হলেও তিনি সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি সম্পন্ন করেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই মানসিকতাই তাঁকে আন্দোলনের দিনগুলোতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার করে তোলে।
মিতুর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় নিহত ও আহত শিক্ষার্থীদের খবর তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদী লেখালেখির পাশাপাশি তিনি রাজপথেও সক্রিয় ছিলেন। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট নেত্রকোণার কুরপাড় এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আহত হন তিনি। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা। পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাঁর চিকিৎসায় ইতোমধ্যে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে এবং তিনি এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও অনলাইন হয়রানির অভিযোগও করেছেন মিতু। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর বিশ্বাস, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ভিন্নমত প্রকাশ এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার সবার থাকা উচিত।
সম্প্রতি জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান মিতু। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং চলমান চিকিৎসার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় মিতু নিজের চিকিৎসার পাশাপাশি নারীদের নিরাপত্তা, সাইবার হয়রানি প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও তুলে ধরেন।
বর্তমানে চিকিৎসার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ এবং সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তাঁর মতে, দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষ নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারবে।
মিতুর গল্প কেবল একজন আহত আন্দোলন-অংশগ্রহণকারীর গল্প নয়; এটি একটি স্বপ্নবান তরুণ প্রজন্মের প্রতিচ্ছবি। শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন বাংলাদেশ আরও মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই স্বপ্ন নিয়েই আজও অপেক্ষায় আছেন কুরপাড়ের এই প্রতিবাদী তরুণী।
জ/উ