জীবননাশের আশঙ্কার কথা জানিয়ে প্রিজনভ্যানে অন্য আসামিদের সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে আসার আবেদন করেছিলেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে কারাগারে রেখেই ভার্চ্যুয়ালি বিচারকাজে অংশ নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) কারাগার থেকেই মামলার কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছেন জিয়াউল আহসান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে ১৫তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম। আজ তাঁকে জেরা করবে আসামিপক্ষ।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, এ পর্যন্ত প্রতিদিনই জিয়াউল আহসানকে নিয়মিত ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে। গত ৮ অক্টোবর তাঁর জীবননাশের আশঙ্কার কথা জানিয়ে আইনজীবী নাজনীন নাহার একটি আবেদন করেন। এতে নিরাপত্তার কারণে অন্য আসামিদের সঙ্গে প্রিজনভ্যানে তাঁকে ট্রাইব্যুনালে আনা-নেওয়ার কথা বলা হয়।
তামিম বলেন, জীবননাশের আশঙ্কা ও নিরাপত্তার বিষয়ে আসামিপক্ষের উদ্বেগের সঙ্গে প্রসিকিউশন একমত হয়েছে। তবে অন্য আসামিদের সঙ্গে প্রিজনভ্যানে আনা-নেওয়ার আবেদনে আপত্তি জানানো হয়। কারণ, একই ধরনের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি অন্য আসামিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় জিয়াউল আহসানকে ট্রাইব্যুনালে না এনে কারাগারে রেখেই ভার্চ্যুয়ালি হাজির করার আবেদন করা হয়। ট্রাইব্যুনালের এজলাস ও কারাগার-উভয় জায়গায় অডিও-ভিজ্যুয়াল কনফারেন্সের ব্যবস্থা রয়েছে। আদালত আবেদন মঞ্জুর করেছেন। সে অনুযায়ী, কারাগারে রেখেই তাঁর মামলার কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য ও অভিযোগ
গত ৮ অক্টোবর এ মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের জবানবন্দি শেষ হয়। তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যে তিনি সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ তুলে ধরেন।
রফিকুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালকে জানান, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জনসমক্ষে এলে সেগুলোকে বৈধতা দিতে লোকদেখানো প্রশাসনিক নির্বাহী তদন্ত করা হতো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে রাখার জন্য নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক তদন্তের আশ্রয় নেওয়া হতো।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, নিয়ন্ত্রিত তদন্ত প্রতিবেদন তৈরির উদ্দেশ্যে প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন করে কর্মকর্তাদের দিয়ে মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং পুলিশ প্রতিবেদন প্রস্তুত করানো হতো। এর লক্ষ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করা।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাঁকে জেরার জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়। সেই অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষের ১৫তম সাক্ষী রফিকুল ইসলামকে জেরা করবে আসামিপক্ষ।
প্রসিকিউশন জানায়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর জবানবন্দি দেন কামরুল ইসলাম। একই দিন মামলার ১৩তম সাক্ষী র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা শেষ হয়। তিনি ছিলেন মামলাটির সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ
এ মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগের সময়কাল ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল। এ সময়ে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগেও ৫০ জনকে হত্যার কথা উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন। অভিযোগ অনুযায়ী, দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে মাসুদসহ ৫০ জনকে হত্যা করা হয়।
এসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। একই দিন প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে।
জ/উ