বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান নেতৃত্বের বিদায়ের পর ৫২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো হয়নি নতুন কমিটি। সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকলেও পদপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক অতীত ও পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের কারণে কমিটি ঘোষণায় কিছুটা সময় লাগছে বলে জানিয়েছে বিএনপির একাধিক সূত্র।
এদিকে ছাত্রদলের কমিটি আটকে থাকায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে পদপ্রত্যাশীদের। এমনকি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথাও বলতে চাচ্ছেন না তারা। কবে কখন ঘোষণা করা হবে নতুন সেই অপেক্ষায় দিন কাটছে পদপ্রত্যাশী নেতাদের।
সূত্রগুলোর দাবি, ছাত্রদলের পদ প্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে নানা অভিযোগের কারণে অধিকাংশই তালিকা থেকে ছিটকে পড়েছেন। যাদের নাম তালিকায় রয়েছে তাদের নিয়ে চলছে নানান হিসাব নিকেশ। বিশেষ করে ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে অতীতে যুক্ত ছিলেন; এমন কেউ যাতে কৌশলে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ঢুকতে না পারেন, সে বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বিএনপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ছাত্র দলের বিভিন্ন ইউনিট কমিটির অনেক নেতাদের বিষয়ে সংগঠনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবার ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় ছাত্রলীগ বা ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন অনেকে বিভিন্ন কৌশলে ছাত্র দলের কমিটিতে আসতে পারে এমন শঙ্কা রয়েছে। নতুন কমিটিতে অনুপ্রবেশ ঠেকানোই হচ্ছে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নতুন কমিটিতে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কয়েক ধাপে তদন্ত হচ্ছে। দলীয় পর্যায়ের অনুসন্ধানের পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে।
পদপ্রত্যাশীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক ভূমিকা, অতীতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। জেলা বিএনপির নেতাদের কাছ থেকেও সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তথ্য নেয়া হচ্ছে।
সূত্রের দাবি, তদন্ত-যাচাইয়ের বড় অংশ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ছাত্রদলের দুইজন হেভিওয়েট পদ প্রত্যাশীর পরিবারে ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন পাওয়া গেছে। এজন্য তারা নতুন কমিটি থেকে ছিটকে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য নেতাদের তালিকা এখন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন মিললেই নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।
ছাত্রদলের পদ প্রত্যাশী বেশ কয়েকজন জানান, তারা জানতে পেরেছেন ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে যারা পদ প্রত্যাশী তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে। এটা নতুন কিছু নয়, নতুন কমিটি ঘোষণার আগে সবসময় খোঁজ নেয়া হয়ে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে, আগামী মাসে যে কোনো সময় কমিটি ঘোষণা হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
সূত্র বলছে, নতুন কমিটি গঠনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্লিন ইমেজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষার্থী রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির সক্ষমতাকে মূল্যায়ন করা হবে। এদিকে শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা শেষ মুহূর্তের সাংগঠনিক তৎপরতা ও লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে গত ১৩ আগস্ট দিবাগত রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে ছাত্রদলের বিদায়ী শীর্ষ পাঁচ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এতে অংশ নেন ছাত্রদলের বিদায়ী কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির, সিনিয়র সহসভাপতি আবু আফসান মো. ইয়াহিয়া, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম ও সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান।
সাক্ষাৎকালে তারেক রহমান ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে নেতাদের অবহিত করেন। ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক তারেক রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে বর্তমান কমিটি থেকে বিদায় নেন সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
তারেক রহমান বিদায়ী নেতৃত্ব ভবিষ্যতে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসবে বলেও আশ্বস্ত করেন। একইসঙ্গে নিয়মতান্ত্রিকভাবে নতুন নেতৃত্ব বের করে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। নেতৃত্বের জট তৈরি করা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ছাত্রদল সভাপতি ও সম্পাদক বিদায়ী বার্তা দেয়ার পর থেকেই নয়াপল্টন ও গুলশানকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে গত পদপ্রত্যাশীদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। কেউ নিজের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরছেন, কেউ আবার জেলা-মহানগর ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের নেতাদের সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
আন্দোলন ও মাঠ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিএনপির ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে পরিচিত জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় ৭ মাস আগে।
বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, যে কোনো কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সংগঠনে জন্য যাদের অবদান রয়েছে তাদের মূল্যায়ন করা হয়। ছাত্রদলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত, মেধাবী, শিক্ষার্থীবান্ধব, পরিশ্রমী ও সৎ তাদেরকেই বেছে নেয়া হবে। দল যখন প্রয়োজন মনে করবে তখনই কমিটি ঘোষিত হবে। তবে সেটি খুব বেশি বিলম্বিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলেও জানান বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।
জ/রা