শেষ ছবি, শেষ নির্যাতনের ভিডিও; বিপদের সংকেত ছিল, তবু রক্ষা হলো না

খন্দকার হানিফ রাজা

অপরাধ

একজন মৃত্যুর দুই দিন আগে ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি পাঠিয়েছিলেন খালাতো বোনকে। অন্যজনকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানোর ভিডিও পাঠিয়েছিলেন তাঁর স্বামীই। দুজনের ক্ষেত্রেই নির্যাতনের অভিযোগ ছিল, ছিল বিপদের স্পষ্ট সংকেত। কিন্তু সেই সংকেতের পরও রক্ষা হয়নি তাঁদের জীবন। অল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যু হয়েছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর ২০ বছরের আল মাইদা আক্তার ও রাজধানীর খিলক্ষেতের মুক্তা ইসলাম মাওয়ার।

2026-09-30T19:33:24+06:00
2026-09-30T19:33:24+06:00
বুধবার ● ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
Advertisement
অপরাধ
শেষ ছবি, শেষ নির্যাতনের ভিডিও; বিপদের সংকেত ছিল, তবু রক্ষা হলো না
খন্দকার হানিফ রাজা
⏲ ৭:৩৩ পিএম | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবার
সংগৃহীত ছবি
একজন মৃত্যুর দুই দিন আগে ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি পাঠিয়েছিলেন খালাতো বোনকে। অন্যজনকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে পেটানোর ভিডিও পাঠিয়েছিলেন তাঁর স্বামীই। দুজনের ক্ষেত্রেই নির্যাতনের অভিযোগ ছিল, ছিল বিপদের স্পষ্ট সংকেত। কিন্তু সেই সংকেতের পরও রক্ষা হয়নি তাঁদের জীবন। অল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যু হয়েছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর ২০ বছরের আল মাইদা আক্তার ও রাজধানীর খিলক্ষেতের মুক্তা ইসলাম মাওয়ার।

মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে মাইদা খালাতো বোনকে নিজের আঘাতের ছবি পাঠিয়ে লিখেছিলেন, ‘আপা, ও আমাকে আজও মারছে।’ ছবিতে ছিল ফোলা চোখ ও মুখে আঘাতের চিহ্ন। খালাতো বোন তাঁকে সংসার ছেড়ে চলে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে থেকে যান মাইদা। এরপরই ঘটে তাঁর মৃত্যু।

পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই স্বামী সিয়াম আল মুরসালিন আকাশের হাতে মারধরের শিকার হতেন মাইদা। একবার সালিসও হয়েছিল। মৃত্যুর পর তাঁকে হাসপাতালে রেখে স্বামী চলে যান বলে পরিবারের ভাষ্য। পরে পুলিশ তাঁকে আটক করে। স্বামীর দাবি, দাম্পত্য কলহের পর মাইদা ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেন। তবে পরিবারের অভিযোগ, তাঁকে হত্যা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর পপ্রকৃত কারণ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলেই নির্ধারিত হবে।

মাইদার দুই সন্তান এখন নানির কাছে। এক বছরের শিশুটি মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত। চার বছরের সন্তানটির কাছ থেকে পরিবার নির্যাতনের কথা জানতে পেরেছে বলেও দাবি করেছে।

অন্যদিকে, রাজধানীর খিলক্ষেতে মুক্তা ইসলাম মাওয়ার মৃত্যুর আগে নির্যাতনের চিত্র উঠে আসে একটি ভিডিওতে। স্বামী সোহেল শিকদার তাঁর ভাইয়ের কাছে ভিডিওটি পাঠান। তাতে মুক্তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে মারধর করতে দেখা যায়। এ সময় সন্তানদের কান্নার শব্দও শোনা যায় বলে সংবাদ পপ্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওর সঙ্গে স্বামীর বার্তা ছিল, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’

এর দুই দিন পর, ৩ সেপ্টেম্বর খিলক্ষেতের বাসা থেকে মুক্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনায় তাঁর স্বামীকে গেপ্রপ্তার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

দুটি ঘটনা দুই এলাকার, দুই পরিবারের। কিন্তু যোগসূত্র একটাইষ্ণস্বামীর হাতে নির্যাতনের অভিযোগ, মৃত্যুর আগে বিপদের সংকেত এবং সেই সংকেতের পরও জীবন রক্ষা না হওয়া। পপ্রশ্ন উঠছে, নির্যাতনের কথা জানার পর একজন নারীকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া, তাঁর ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কার্যকর সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

জাতীয় জররুরি সেবা ৯৯৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী নির্যাতনসংক্রান্ত ২৭ হাজার ৯১১টি অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে ১৭ হাজার ১৯৬টি, অর্থাৎ পপ্রায় ৬২ শতাংশ, ছিল স্বামীর বিররুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ। আট মাসে প্রতিদিন গড়ে ১১৫টির বেশি অভিযোগ এসেছে এই সেবায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপির ২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপেও উঠে এসেছে সহিংসতার ব্যাপকতা। জরিপ অনুযায়ী, জীবনের কোনো না কোনো সময়ে ৭৬ শতাংশ নারী ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত এক বছরেও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ৪৯ শতাংশ নারী। স্বামীর শারীরিক বা যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের বড় একটি অংশ কাউকে বিষয়টি জানাননি।

মাইদার ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি আর মুক্তার নির্যাতনের ভিডিও তাই শুধু দুটি মৃত্যুর আগের স্মৃতি নয়; এগুলো ঘরের ভেতরের সহিংসতা মোকাবিলায় সুরক্ষা নিশ্চিত করার ব্যর্থতা নিয়ে পপ্রশ্ন তুলছে। একজন নারী যখন জানান, ‘ও আমাকে আজও মারছে’, তখন সেই বার্তাকে পারিবারিক কলহ নয়, সম্ভাব্য পপ্রাণঘাতী সহিংসতার সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা কতটা জররুরিষ্ণদুই মৃত্যু সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।




জ/বা


  বিষয়:   অপরাধ  হত্যা  নির্যাতন  বিবিএস  ইউএনএফপির 


Advertisement
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত