জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের আপত্তি ও উদ্বেগের মধ্যেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন শুরু করেছে মালয়েশিয়া। প্রথম দফায় ১ হাজার ৪৭৬ জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে দেশটি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) শুরু হওয়া এই প্রত্যাবাসন কর্মসূচি মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের বৃহত্তর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ। পুরো কর্মসূচিতে প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কথা রয়েছে।
মালয়েশিয়া সরকার বলছে, প্রত্যাবাসন সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক। তবে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে শরণার্থীদের ফিরে যাওয়া কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার সকালে মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের লুমুট নৌঘাঁটির কাছে একটি স্টেডিয়ামে নিরাপত্তা যানসহ বেশ কয়েকটি বাস আসে। পরে এসব বাসে করে রোহিঙ্গাদের বন্দর এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে মিয়ানমারের দুটি নৌযান ও একটি হাসপাতাল জাহাজ প্রস্তুত ছিল।
মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বার্নামার তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ফেরত পাঠানো ১ হাজার ৪৭৬ জনের মধ্যে ১ হাজার ৩৭০ জন পুরুষ, ৭৯ জন নারী, ২০ জন ছেলে ও ৭ জন মেয়ে শিশু রয়েছে। তাদের বয়স ৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।
মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিয়ানমার সরকারই প্রত্যাবাসনের জন্য এসব ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে। পরবর্তী ধাপগুলোতে পরিচয়, নথিপত্র ও তথ্য যাচাইয়ের পর আরও মানুষকে ফেরত পাঠানো হবে। তবে এ প্রক্রিয়ায় ইউএনএইচসিআরের সরাসরি সম্পৃক্ততা নেই।
ইউএনএইচসিআর আগেই সতর্ক করে বলেছিল, মিয়ানমারে চলমান সশস্ত্র সংঘাত ও সহিংসতার কারণে শরণার্থীদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি উপযোগী নয়। ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়াতেও তারা অংশ নেয়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, প্রত্যাবাসনের পক্ষে আর্থিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়েছে মালয়েশিয়া। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়টি ঝুলে থাকায় সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকটও দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, চলতি বছর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অনলাইনে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর দেশটিতে তাদের ওপর হয়রানি ও সামাজিক চাপ বেড়েছে।
তবে আজ মঙ্গলবার যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাদের জাতিগত পরিচয়, শরণার্থী মর্যাদা কিংবা তাদের মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা-এসব বিষয়ে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিস্তারিত কোনো তথ্য দেয়নি।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার নিবন্ধিত শরণার্থী রয়েছেন। তাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোহিঙ্গা।
গত জুলাইয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছিলেন, মিয়ানমার ৫ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার প্রত্যাবাসনের জন্য বাছাই করা প্রায় ১ হাজার ৫০০ জন ওই দলেরই অংশ বলে জানিয়েছে আলজাজিরা।
এদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থী বা ইউএনএইচসিআর-স্বীকৃত শরণার্থী থাকলে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মালয়েশিয়া ও অ্যাসাইলাম অ্যাক্সেস মালয়েশিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছে, মালয়েশিয়া জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী দেশ না হলেও এই প্রত্যাবাসন ‘নন-রিফুলেমেন্ট’ নীতির লঙ্ঘন।
প্রত্যাবাসনের জন্য ব্যক্তিদের কীভাবে শনাক্ত করা হয়েছে এবং মিয়ানমারে পৌঁছানোর পর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠন দুটি।
জ/উ