জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত বৃহস্পতিবার ভাষণ শুরু করার পর বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদল সভাকক্ষ ছেড়ে ওয়াকআউট করেছে। এ সময় সাধারণ পরিষদ কক্ষের বড় একটি অংশ ফাঁকা হয়ে যায়।
জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে পাওয়া প্রতিবেদন ও ফুটেজে দেখা যায়, নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় কক্ষ ছেড়ে যাওয়া অথবা আসন খালি থাকা প্রতিনিধিদলগুলোর মধ্যে ছিল সৌদি আরব, সুদান, তিউনিসিয়া, উজবেকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, আলজেরিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, মন্টিনিগ্রো ও কিরগিজস্থান। এ ছাড়া জর্ডান, লিবিয়া, মার্শাল আইল্যান্ডস ও মরিশাসের প্রতিনিধিদলের আসনও খালি দেখা যায়। তবে এসব দেশের কয়েকটি প্রতিনিধিদল একজন করে প্রতিনিধি হলে রেখে গিয়েছিল।
আনাদোলুর এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, নেতানিয়াহু পোডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় প্রায় ৭০টি দেশের প্রতিনিধিরা হয় সভাকক্ষ ত্যাগ করেন, নয়তো নিজেদের আসন ফাঁকা রাখেন। আনাদোলুর তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ছিল তুরস্ক, ফিলিস্তিন, তিউনিসিয়া, সিরিয়া, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, মিসর, ইরাক, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরান, কাতার, লেবানন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত, স্পেন, ব্রাজিল, পেরু, কিউবা, নাইজেরিয়া, ঘানা, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ওমান, নাইজার, মাদাগাস্কার, বতসোয়ানা, দ্য বাহামাস, অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা এবং ক্যাবো ভার্দে।
তবে কোন কোন দেশের প্রতিনিধিদল সুনির্দিষ্টভাবে কক্ষ ত্যাগ করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি। খালি থাকা আসনের ছবি বিশ্লেষণ করেও কিছু তথ্য তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওয়াকআউট নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া
কূটনীতিকেরা একে একে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেও নেতানিয়াহু তার বক্তব্য চালিয়ে যান। এ সময় গ্যালারিতে থাকা তার সমর্থকেরা করতালি দিয়ে তাকে অভিবাদন জানান।
ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্ষ ত্যাগকারী প্রতিনিধিদের ‘ভণ্ড মানবাধিকার আন্দোলনকারী’ বলে অভিহিত করেন নেতানিয়াহু। ওয়াকআউটের পরও যারা সভাকক্ষে অবস্থান করছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাদের ‘কাপুরুষ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নিজের ভাষণে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে-এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল কোনো গণহত্যা চালায়নি। ইসরায়েল গণহত্যা রোধ করেছে।’
এ সময় নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিরও সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু। মামদানি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছিলেন। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হওয়ার জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি।
নেতানিয়াহুর বক্তব্যের জবাব মামদানির
নেতানিয়াহুর ভাষণ শেষ হওয়ার পর নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো গণহত্যাকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের মঞ্চকে ব্যবহার করে নেতানিয়াহু ‘ভিত্তিহীন মিথ্যা’ পুনরাবৃত্তি করেছেন।
মামদানি বলেন, ‘তিনি বারবার যেমনটি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবারও ফিলিস্তিনিদের ওপর তার গণহত্যাকে ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন মিথ্যার পুনরাবৃত্তি করতে তার ভাষণকে ব্যবহার করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো মিথ্যাই এই সত্যকে পরিবর্তন করতে পারবে না, যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখোমুখি হয়ে আছেন।’
২০২৪ সালের নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করার পাশাপাশি আদালতের ওই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
জাতিসংঘের বাইরে বিক্ষোভ
কূটনৈতিক ওয়াকআউটের পাশাপাশি ম্যানহাটনজুড়েও নেতানিয়াহু এবং গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে বিভিন্ন বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শত শত বিক্ষোভকারী জাতিসংঘের কাছে জড়ো হয়ে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেন এবং ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সহায়তার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। পরে রাস্তা পরিষ্কার করতে পুলিশ মোতায়েন করা হলে কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়।
ইহুদি, মুসলিম ও ফিলিস্তিনি বিভিন্ন দল পৃথকভাবে বিক্ষোভের আয়োজন করে। এ ছাড়া প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠনগুলো নেতানিয়াহুর নীতির বিরোধিতা করে জাতিসংঘের কাছে পৃথক একটি র্যালি বের করে।
সবচেয়ে বড় কর্মসূচির আয়োজন করে ‘জুয়িশ ভয়েস ফর পিস’। পুলিশ পরে জানায়, ১০০ জনের বেশি মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ও রাজনীতিবিদও ছিলেন।
এসব বিক্ষোভ ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের জনমতে বিদ্যমান বিভাজনের বিষয়টিও সামনে আনে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনমতের চিত্র
মে মাসে পিউ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে ১৮ শতাংশ ইসরায়েলি সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এ হার ৪৭ শতাংশ।
অন্যদিকে, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ৫৮ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে এ হার ৪৭ শতাংশ।
জ/উ