হুথি চাপে সংকটে সৌদি, অনিশ্চিত মার্কিন সহায়তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

2026-09-15T19:34:02+06:00
2026-09-15T19:34:02+06:00
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
আন্তর্জাতিক
হুথি চাপে সংকটে সৌদি, অনিশ্চিত মার্কিন সহায়তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রভাব থেকে বের হতে পারছে না সৌদি আরব। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি রিয়াদকে নতুন করে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করছে। এরই মধ্যে সৌদি আরবের তেল বাণিজ্যও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে, যা সংকটে থাকা বিশ্ব অর্থনীতিতে বাড়িয়েছে নতুন উদ্বেগ।

গত কয়েক সপ্তাহে ইয়েমেনের হুথিরা সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এতে দেশটির তেল সরবরাহ ও রপ্তানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত অবস্থান। পুরো সংঘাতজুড়েই ওয়াশিংটনের ভূমিকা স্পষ্ট ছিল না। আগামী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও অজনপ্রিয় ও স্থবির হয়ে পড়া মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী নন বলেই মনে হচ্ছে।

ইরানের হাতে নতুন কৌশলগত সুবিধা
সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত তাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ইরান, সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠক গত সপ্তাহের শেষ দিকে আকস্মিকভাবে স্থগিত হয়ে যায়। দুই পক্ষের অবস্থানের ব্যাপক ব্যবধানই এর কারণ বলে জানা গেছে।

লোহিত সাগরে হুথিদের অগ্রগতি যেমন বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ বাড়াচ্ছে, তেমনি হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কিছুটা কমে যাওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে ইরান আরও একটি কৌশলগত সুবিধা পেয়েছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি পরিস্থিতিকে রিয়াদের জন্য ‘অত্যন্ত হতাশাজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ইরানের প্রতি তীব্র বৈরিতা থাকলেও সৌদি আরব কখনোই এই যুদ্ধ চায়নি। বরং যুদ্ধ নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগ ছিল। সংঘাত শুরুর পর সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় আশঙ্কাগুলোই এখন বাস্তবে পরিণত হচ্ছে।

সৌদি সরকার এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সৌদি কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) বলেছেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে লোহিত সাগরে মুক্ত নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাবে তারা।

সংকুচিত হচ্ছে রিয়াদের কৌশলগত পরিসর
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান গত কয়েক বছর ধরে দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারে বড় ধরনের উদ্যোগ নেন। অতিরক্ষণশীল সৌদি আরবকে আধুনিক, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করাই ছিল তাঁর পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

তবে ২০২৩ সালে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া সংঘাত সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দেয়। পরবর্তী সময়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে ইরানের সঙ্গেও। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে। এতে হরমুজ প্রণালির কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বিকল্প রপ্তানি পথ ব্যবহার শুরু করে। আরব উপদ্বীপের ভেতর দিয়ে পাইপলাইনে তেল লোহিত সাগরে এনে সেখান থেকে মিসরের সুমেড পাইপলাইন ও সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে এশিয়ায় পাঠানো হচ্ছিল।

কিন্তু জুলাই থেকে হুথিদের সঙ্গে উত্তেজনা আবারও বাড়তে থাকে। লোহিত সাগরে সৌদি সামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর অবরোধ এবং প্রায় চার বছর পর বড় ধরনের হামলা শুরু করে হুথিরা।

জটিল হচ্ছে হুথি সংকট
মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ইরান-সমর্থিত হুথিরা সৌদি আরবের পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর-তিন দিক থেকেই হামলা জোরদার করেছে।

আগস্টের শেষ দিকে হরমুজ প্রণালিতে সৌদি একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলায় দুই নাবিক নিহত হন। এরপর গত সপ্তাহে হুথিরা দাবি করে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দরনগরী ও লোহিত সাগরের একটি দ্বীপ দখল করেছে তারা। এর ফলে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদির তেল রপ্তানির পথ পুরোপুরি আটকে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের দাবি করে গোষ্ঠীটি।

এরপর সৌদি আরব জানায়, ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন হামলার কারণে পূর্বাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলো থেকে লোহিত সাগরমুখী মূল পাইপলাইনের সরবরাহ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে তারা। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার পর লোহিত সাগরে তেল পাঠানোর এটিই ছিল রিয়াদের প্রধান ও কার্যত একমাত্র বিকল্প পথ।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কপলারের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলার সরাসরি প্রভাবে এশিয়ায় সৌদি তেল রপ্তানিতে বড় পতন হয়েছে। জুনে দৈনিক ৩৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হলেও আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১ লাখ ২৮ হাজার ব্যারেলে। চলতি মাসে কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে রপ্তানি।

২০১৫ সাল থেকে হুথিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে সৌদি আরব। তবে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী খুব বেশি সাফল্য পায়নি। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির আগে দীর্ঘ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিহত হন এবং ইয়েমেন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়।

সীমিত বিকল্পের মুখে রিয়াদ
চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিল কুইলিয়াম বলেন, সৌদি আরব কয়েক বছর ধরে ইয়েমেন সংঘাত থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

তাঁর মতে, হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি রিয়াদকে আবার সামরিক জবাব দেওয়ার পথে ঠেলে দিচ্ছে। তবে সামনে থাকা প্রতিটি বিকল্পের জন্যই সৌদি আরবকে বড় মূল্য দিতে হবে এবং ফলাফলও অনিশ্চিত।

সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা সংস্থা এসিএলইডির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান শেরওয়ান হিন্দরিন আলী বলেন, রিয়াদের সামনে এখন সামরিক অভিযান জোরদার করে হুথিদের পিছু হটানো ছাড়া কার্যকর পথ সীমিত। তবে এতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং সৌদির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হুথিদের হামলা আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, অতীতেও সৌদি আরব এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবে এখন হুথিদের হাতে আগের তুলনায় অনেক বেশি অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে সৌদির প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদও কমে গেছে।

এ অবস্থায় হুথি কিংবা তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গে সরাসরি সমঝোতার কূটনৈতিক পথও বেছে নিতে পারে রিয়াদ।

তবে হুথিরা দাবি করেছে, তাদের ওপর আরোপিত সব ধরনের সৌদি অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। এই শর্ত মেনে নিলে দীর্ঘমেয়াদে হুথিরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বড় কোনো সুবিধা না পেলে আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় তেহরানেরও খুব বেশি আগ্রহ থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনকে নিয়ে অনিশ্চয়তা
নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো। তাই বর্তমান সংকটে ট্রাম্প প্রশাসন পাশে দাঁড়াবে-এমন প্রত্যাশা রিয়াদের থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু ট্রাম্পের ভূমিকা সেই আস্থায় বারবার চিড় ধরিয়েছে।

২০১৯ সালে হুথিদের হামলায় সৌদি আরবের মোট তেল উৎপাদনের অর্ধেক সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলেও সে সময় ট্রাম্প প্রশাসন বড় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। চলতি বছরের শুরুতে ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানে হামলার আগেও উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত পরামর্শ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ইরানি হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরবকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র‌্যাটনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সৌদি আরবের মতো একটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে শক্তিশালী নিরাপত্তা অংশীদারত্ব গড়ে তোলে, তার মূল উদ্দেশ্যই হলো এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে সহায়তা পাওয়া।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন।

বাইডেন প্রশাসনের সময়ে পেন্টাগনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ড্যান শাপিরো বলেন, ইরানের সঙ্গে অনিশ্চিত সংঘাতের মধ্যেই রয়েছে মার্কিন বাহিনী। একই সঙ্গে নৌবাহিনীর সক্ষমতা ও অস্ত্রের মজুদও কমে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প নতুন কোনো যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলতে চাইবেন না-এটাই স্বাভাবিক। তবে সৌদি আরবের জন্য এটি অত্যন্ত হতাশাজনক বার্তা।

হুথি সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে কতটা সামরিক সহায়তা দেবে, তা এখনো আলোচনার বিষয়। আপাতত ওয়াশিংটন রিয়াদকে মূলত গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, এপি

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]