সিঙ্গাপুরের ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থপাচারবিরোধী অভিযানে জব্দ হয়েছিল বিলাসপণ্যের বিশাল এক সংগ্রহ। গাড়ি, বাড়ি, সোনা, নগদ অর্থের পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছিল শত শত দামি হ্যান্ডব্যাগ, গয়না ও ঘড়ি।
চার শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সমন্বিত এই অভিযানের তিন বছর পর সেই জব্দ করা বিলাসপণ্যই এখন নিলামে তুলছে সিঙ্গাপুর। শ্যানেল ও লুই ভিতোঁর মতো ব্র্যান্ডের পণ্যসহ এই বিশাল সংগ্রহ বিক্রি হবে নিলামে।
দেশটির বিমানবন্দরের কাছে একটি গোপনীয় সংরক্ষণাগারের জানালাবিহীন, কংক্রিটের দেয়ালঘেরা একটি কক্ষে সংগ্রাহকদের জব্দ করা শত শত পণ্য দেখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। সেখানে প্রদর্শিত হচ্ছে কার্টিয়েরের আংটি, বুলগারির নেকলেস ও এরমেসের ‘কেলি’ ব্রেসলেট। সঙ্গে রয়েছে শ্যানেল ও লুই ভিতোঁর মতো ব্র্যান্ডের সারি সারি হ্যান্ডব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রী।
পণ্যের পরিমাণ এত বেশি যে বাজারে একসঙ্গে এত পণ্য আসার চাপ এড়াতে আগামী মে পর্যন্ত ১৫টি নিলামে এগুলো বিক্রি করা হবে।
সিঙ্গাপুরের উচ্চনিরাপত্তার ফ্রিপোর্টের প্রদর্শনী কক্ষ ঘুরে সিএনএনকে এসব দেখানোর সময় নিলাম প্রতিষ্ঠান হটলটজের সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্রিস্টোফার ল্যানিগান-ও’কিফ বলছিলেন, ‘এখানে বিলাসবহুল হ্যান্ডব্যাগের যে পরিমাণ, গয়নার যে বিপুল সংগ্রহ, সবই উচ্চমানের এবং সেরা গয়না নির্মাতাদের তৈরি। এমনটা আমরা প্রতিদিন দেখি না।’
তিনি বললেন, ‘ভাগ্য ভালো হলে এমন এক-দুটি জিনিস দেখা যেতে পারে। কিন্তু সব একসঙ্গে থাকা বেশ অস্বাভাবিক।’
দুই বছর ধরে তদন্তের পর দেশজুড়ে চালানো পুলিশের ওই অভিযানে ৩০০ কোটি সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারের (প্রায় ২ লাখ ৯০ হাজার ৬৯ কোটি) বেশি মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছিল।
নগদ অর্থ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও সোনার বার ছাড়াও কর্মকর্তারা জব্দ করেছিলেন সম্পত্তি, স্পোর্টস কার, ওয়াইন, মদ, ইলেকট্রনিকস এবং শত শত বেয়ারব্রিক। বেয়ারব্রিক হলো জাপানের সংগ্রহযোগ্য টেডি বিয়ার আকৃতির খেলনা, যেগুলোর কোনো কোনোটি ছয় অঙ্কের দামে বিক্রি হতে পারে।
পরে চীনের ১০ নাগরিক অর্থপাচার ও জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। তাদের অনেকের কাছেই কম্বোডিয়া ও তুরস্কসহ অন্য দেশের পাসপোর্ট ছিল।
সিঙ্গাপুরে তাদের ব্যবসা ও সম্পত্তি ছিল। প্রসিকিউটর বলেছিলেন, তারা বিদেশে সংঘটিত অপরাধ থেকে পাওয়া অর্থ সিঙ্গাপুরে এনে এসব ব্যবসা ও সম্পত্তির মাধ্যমে ব্যবহার করতেন।
প্রত্যেককে ১৩ থেকে ১৭ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে সবাই এরই মধ্যে মুক্তি পেয়েছেন এবং তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
জব্দ করা বিলাসপণ্যের সঙ্গে বিদেশে পলাতক ১৭ সন্দেহভাজনেরও যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৫ জন ইন্টারপোলের নোটিশ প্রত্যাহারের বিনিময়ে নিজেদের সম্পদ সিঙ্গাপুরের কাছে সমর্পণে রাজি হন।
নিলামে ওঠা কিছু পণ্যে তাদের অবৈধ অতীতের চিহ্নও রয়েছে। যেমন, ১৮ ক্যারেট সোনার একটি আংটিতে ‘এসএইচজে’ আদ্যক্ষর খোদাই করা আছে। এই আদ্যক্ষর দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের একজন সু হাইজিনের নামের সঙ্গে মিলে যায়।
তবে বেশির ভাগ পণ্যই ভালো বা প্রায় নতুন অবস্থায় রয়েছে। পুনর্বিক্রয় বাজারে একই ধরনের বৈধ পণ্যের সঙ্গে এগুলোকে আলাদা করাও কঠিন।
হটলটজও এসব পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেছে সেই হিসাবেই। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত অনলাইনে চলবে নিলাম প্রতিষ্ঠানের প্রথম দুটি বিক্রয়। এগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৩৯ লাখ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার পাওয়া যেতে পারে। বিক্রির অর্থ সরাসরি সিঙ্গাপুরের সরকারি কোষাগারে যাবে।
ল্যানিগান-ও’কিফ মনে করেন, পণ্যগুলোর উৎস চূড়ান্ত দামের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলবে না।
তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক সংগ্রাহক বা ক্রেতার এ বিষয়ে নিজস্ব মত থাকবে। কারও কাছে হয়তো বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আবার কারও কাছে এসব পণ্যের কিছু কিছু সংগ্রহ করা কঠিন।’
পণ্যগুলো বিক্রির প্রস্তুতি চলছে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তদন্তকারীদের জব্দ করা নগদ অর্থ ছাড়া অন্যান্য সম্পদ বিক্রির দায়িত্ব ডেলয়েটকে দেয় সিঙ্গাপুর।
পরে হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠানটি ৮০টির বেশি সম্পত্তি নিলাম বা বিক্রির জন্য চারটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো এসআরআই, নাইট ফ্র্যাঙ্ক, এডমুন্ড টাই অ্যান্ড কোম্পানি এবং লিস্ট ইন্টারন্যাশনাল রিয়েলটি।
এসব সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে নরম্যান ফস্টারের নকশা করা সাউথ বিচ আবাসন প্রকল্পের চার বেডরুমের একটি পেন্টহাউস। চলতি মাসের শেষ দিকে এটি ২ কোটি ৫৩ লাখ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার বা তার বেশি দামে বিক্রি হতে পারে।
অন্যদিকে, বিলাসপণ্যগুলো থেকে যতটা সম্ভব অর্থ আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় হটলটজকে। গত চার মাস ধরে নিলাম প্রতিষ্ঠানটি এসব পণ্যের সত্যতা যাচাই ও মূল্য নির্ধারণের কাজ করেছে।
ল্যানিগান-ও’কিফ বলেছেন, এসব পণ্য ‘নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস বা হংকংয়ের যেকোনো শীর্ষ নিলামে সহজেই মানিয়ে যাবে’।
তিনি আরও বললেন, ‘একটি সিরিজে এই মানের এত পণ্য একসঙ্গে বিক্রির সুযোগ পাওয়া প্রায় নজিরবিহীন।’
সবচেয়ে বেশি দামের সম্ভাবনা রয়েছে ১৫ ক্যারেটের হলুদ হীরার একটি আংটির। হটলটজের ধারণা, এটি সর্বোচ্চ ৩ লাখ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারে বিক্রি হতে পারে।
এরমেসের ও ব্রিটিশ গয়না নির্মাতা গ্রাফের তৈরি আংটিগুলো থেকেও ছয় অঙ্কের দাম পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এদিকে লুই ভুতোঁর প্রয়াত জাপানি শিল্পী ইয়ায়োয়ি কুসামার সঙ্গে করা একটি সহযোগিতামূলক সংগ্রহের কুমড়ার আকৃতির হ্যান্ডব্যাগ ইতিমধ্যে নির্ধারিত নিলামমূল্য ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত এর সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ৩৯ হাজার সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার।
অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রয়েছে হীরাখচিত বেল্ট, চুলের ক্লিপ এবং শিশুদের গয়না। এসবের মধ্যে রয়েছে কঠিন সোনা দিয়ে তৈরি ছোট পায়ের নূপুর, আংটি ও ব্রেসলেট। মামলার সন্দেহভাজনদের মালিকানায় ছিল এসব পণ্য।
পরবর্তী নিলামগুলোতে থাকবে বিলাসবহুল ঘড়ি। থাকবে বিপুলসংখ্যক এরমেসের হ্যান্ডব্যাগও। হটলটজ জানিয়েছে, এমন হ্যান্ডব্যাগের সংখ্যা প্রায় ২৫০টি। এগুলো নিয়ে দুটি আলাদা নিলাম হবে। প্রথমটি হওয়ার কথা নভেম্বরে।
নিলামগুলো অনলাইনে আয়োজন করছে হটলটজ। এর মাধ্যমে শুধু সিঙ্গাপুর নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদেরও আকৃষ্ট করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
দামের শুরু মাত্র ১২০ সিঙ্গাপুরিয়ান ডলার থেকেও। যেমন মিউ মিউর একটি আংটি বা গুচির একটি চুলের ক্লিপ এই দামে পাওয়া যেতে পারে। ফলে এসব পণ্য শুধু অতি ধনী ব্যক্তিদের জন্য নয়।
ল্যানিগান-ও’কিফ বললেন, ‘সবচেয়ে দামি জিনিসই সব সময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয় না।’
সূত্র: সিএনএন
জ/রা