বৃ-চাপিলা শাহী মসজিদ ঘিরে মুঘল আমল ও ‘গায়েবি’ নামের লোককথা একসময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা ছিল পুরো এলাকা। বেতের ঝোপ আর বাঁশঝাড়ে পথ হারিয়ে যেত। মানুষের বসতি সরে গিয়েছিল দূরে। সেই নির্জনতার বুকেই দাঁড়িয়ে ছিল ইট-সুরকির একটি পুরোনো মসজিদ। মানুষ হারিয়ে গেলেও মসজিদটি হারায়নি, জঙ্গলের আড়ালে থেকে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী।
নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চাপিলা ইউনিয়নের বৃ-চাপিলা গ্রামের বৃ-চাপিলা শাহী জামে মসজিদ আজ স্থানীয়দের কাছে ‘গায়েবি মসজিদ’ নামেও পরিচিত। প্রায় চারশ বছরের পুরোনো বলে পরিচিত এই মসজিদে এখনো নিয়মিত নামাজ হয়।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন জঙ্গলের আড়ালে থাকার পর বসতি গড়তে গিয়ে মানুষ আবার মসজিদটির সন্ধান পায়। বিস্মিত মানুষ বলতে শুরু করেন, মসজিদটি বুঝি ‘গায়েব’ হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকেই ‘গায়েবি মসজিদ’ নামের প্রচলন। তবে অলৌকিকভাবে মসজিদটি গায়েব বা প্রকাশ পেয়েছিল-এমন কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
স্থানীয় ইতিহাস ও গুরুদাসপুর উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে-১৬২৮ থেকে ১৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে-মসজিদটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। স্থানীয় ভাবে প্রচলিত আছে, তখন চাপিলা ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক এলাকা। শাহ সুজা বাংলার সুবাদার থাকাকালে এখানে মুঘল সেনাদের একটি ফাঁড়ি ছিল বলেও জনশ্রুতি রয়েছে।
মুঘল কর্মকর্তা মুনশি এনায়েতউল্লাহ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। প্রবীণদের ভাষ্য, মসজিদের গায়ে তাঁর নাম খোদাই করা ছিল। তবে মসজিদের প্রকৃত নির্মাণকাল ও প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় নিশ্চিত করতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা প্রয়োজন।
মসজিদটির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া চাপিলা জনপদের কথাও। একসময় এখানে মানুষের বসতি ছিল। পরে মানুষ অন্যত্র চলে গেলে ঘরবাড়ি ও পথ হারিয়ে যায়, জায়গাটি ঢেকে যায় জঙ্গলে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে নতুন করে বসতি গড়তে শুরু করলে জঙ্গল পরিষ্কারের সময় আবার দৃশ্যমান হয় মসজিদটি। পরে সংস্কার করে সেখানে নামাজ শুরু হয়।
মূল মসজিদটি ইট-সুরকিতে নির্মিত। দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট, প্রস্থ ২০ ফুট এবং দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় চার ফুট। তিনটি গম্বুজ ও দুটি মিনার রয়েছে। প্রাচীন অংশে ছিল তিনটি দরজা, পরে সম্প্রসারণের পর বর্তমানে দরজা পাঁচটি। মেহরাব, দরজা ও দেয়ালের কিছু অলংকরণে এখনো পুরোনো স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে। তবে সময় ও বিভিন্ন পর্যায়ের সংস্কারে অনেক কারুকাজ হারিয়ে গেছে।
চাপিলা সাধুপাড়ার প্রবীণ ব্যক্তি এমদাদুল হক জবাবদিহিকে জানান, একসময় মসজিদের চারপাশ ছিল ঘন জঙ্গল। বাঘের ভয়ও ছিল। মুসল্লিদের পালা করে পাহারা দিতে হতো। তবু নামাজ বন্ধ হয়নি। মসজিদ পরিচালনা কমিটির ক্যাশিয়ার ফারুক হোসেন তাঁর নানা মিয়া হোসেন সরকারের মুখে শুনেছেন, বেতের ঝোপঝাড়ের আড়ালে একসময় মসজিদটি প্রায় অদৃশ্য হয়ে ছিল। মিয়া হোসেন সরকার ময়মনসিংহ থেকে এসে বৃ-চাপিলায় বসতি স্থাপন করেছিলেন।
মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল্লাহ জবাবদিহিকে জানান, ১৯৯০ সালের পর মুসল্লি বাড়ায় মসজিদের পরিসর সম্প্রসারণ করা হয়। বর্তমানে প্রতি ওয়াক্তে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন এবং জুমার দিনে ২০০ থেকে ২৫০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করেন।
স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল হান্নান জবাবদিহিকে বলেন, ১৯২০ সালের রেকর্ডে শাহী মসজিদের নামে প্রায় ৬৫ বিঘা জমি দানের উল্লেখ রয়েছে। মুনশি এনায়েতউল্লাহ ওই জমি দান করেছিলেন বলে রেকর্ডে পাওয়া যায়।
এলাকাবাসীর কাছে মসজিদটি ধর্মীয় স্থাপনার পাশাপাশি এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তাঁদের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের মাধ্যমে মসজিদটির প্রকৃত বয়স ও নির্মাণকাল যাচাই করে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। কারণ একটি প্রাচীন স্থাপনা হারিয়ে গেলে শুধু ইট-সুরকি হারায় না, হারিয়ে যায় একটি জনপদের স্মৃতি, মানুষের জীবন ও ইতিহাসের একটি অধ্যায়।
আজ মসজিদের চারপাশে আর সেই জঙ্গল নেই। নেই বাঘের ভয়। আছে মানুষের বসতি, কোলাহল আর প্রতিদিনের জীবন। কিন্তু পুরোনো দেয়ালগুলো যেন এখনো বলে যায় হারিয়ে যাওয়া চাপিলার কথা। ‘গায়েবি’ নামটি লোককথা হতে পারে, কিন্তু মসজিদটি বাস্তব ইতিহাস। জঙ্গলের আড়াল থেকে ফিরে আসা এই প্রাচীন স্থাপনা আজও দাঁড়িয়ে আছে-চারশ বছরের এক নীরব সাক্ষী হয়ে