নজরুল ইসলাম মজুমদার-নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। একই সময়ে বছরের পর বছর বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও ছিলেন।
শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগের বিষয়টিকে প্রভাব হিসেবে ব্যবহার করে নজরুল ইসলাম মজুমদার ব্যাংক খাতে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করেছিলেন বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠে এসেছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও তহবিলের নামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে ব্যাংক খাতে তার প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য।
ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের শীর্ষ পদে থাকার কারণে ব্যাংক মালিকদের ওপর প্রভাব, সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ-এই তিনটি বিষয় তার শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক খাতের কয়েকজনের ভাষ্য, তিনি ওই সময়ে এ খাতের আতঙ্কে পরিণত হয়েছিলেন। প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা না বললেও অনেক ব্যাংক মালিক আড়ালে তাকে ‘ব্যাংক চাঁদাবাজ’ হিসেবে অভিহিত করতেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে নজরুলের বিরুদ্ধে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই অর্থের একটি বড় অংশ দেশে বিনিয়োগ না করে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ আইল অব ম্যান, জার্সি ও হংকংসহ বিভিন্ন দেশে এসব অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে। বিদেশে একাধিক কোম্পানি গঠন, বিপুল সম্পদ কেনা এবং ব্যাংক হিসাব খোলার তথ্যও অনুসন্ধানে এসেছে।
এরই মধ্যে জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামের প্রকৃত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে থাকা ৫৩ লাখ পাউন্ড জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।
দুদকের আবেদনে বলা হয়েছে, নজরুল ইসলাম মজুমদার, তার পরিবারের সদস্য ও সহযোগীরা বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে দেশের ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এসব অর্থের একটি বড় অংশ আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পাচার করা অর্থের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন দেশ ও বিশেষ স্থানের নামও উঠে এসেছে।
দুদকের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে বিদেশে নেওয়ার ক্ষেত্রে নজরুল ইসলাম মজুমদার একাধিক কৌশল ব্যবহার করেছেন বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকঋণ, বাণিজ্যিক লেনদেন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরে এসব অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে থাকা কোম্পানি ও ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থ সরানো ও পাচারের ক্ষেত্রে জটিল বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
জার্সির হিসাবে ৫৩ লাখ পাউন্ড
দুদকের অনুসন্ধানে নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিদেশি সম্পদের যে তথ্য সামনে এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। আইল অব ম্যানের ঠিকানায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সালের ১৭ মে প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই বছরের ২ অক্টোবর জার্সির ইউবিএস ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির নামে একটি ব্যাংক হিসাব খোলা হয়। গত ৬ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, ওই হিসাবে ৫ দশমিক ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ৫৩ লাখ পাউন্ড জমা ছিল। দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত মালিক হিসেবে নজরুল ইসলাম মজুমদার ও তার স্ত্রী নাসরিন ইসলামের নাম উঠে এসেছে।
এই অর্থ সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা এবং সম্পদ হস্তান্তর ঠেকাতে আদালতে অর্থ ও সম্পদ জব্দের আবেদন করে দুদক। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জার্সির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওয়ান ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব এবং ওই প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন।
২৬ ব্যাংকে ঋণের বিস্তৃত অভিযোগ
নজরুল ইসলাম মজুমদারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ নেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। দুদকের অনুসন্ধানে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একাধিক ব্যাংক থেকে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো ক্ষেত্রে গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে, আবার কোথাও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধায় ঋণ অনুমোদন ও পুনঃতফসিলের অভিযোগও রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট নথি ও অনুসন্ধানে এমন তথ্যও উঠে এসেছে যে, এক ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ দিয়ে অন্য ব্যাংকের দায় সামাল দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। একটি ব্যাংক থেকে নাসা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নেওয়ার তথ্য এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৯৯৮ কোটি টাকা বিশেষ বিবেচনায় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও এসব ঋণ নিয়ে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট অনুসন্ধানে জানা গেছে। নাসা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও সুতা ব্যবসার প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঋণের বড় অংশ দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংকের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি-দুই ধরনের ব্যাংকই রয়েছে।
দুদকের সর্বশেষ অনুসন্ধানে নজরুল ইসলাম মজুমদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
ব্যাংকের অর্থ বিদেশে সরানোর অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল অর্থের একটি অংশ দেশের বাইরে স্থানান্তরের বিষয়টি। বিদেশে অর্থ পাঠানোর বিভিন্ন পথ খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
আমদানি-রপ্তানি ব্যবসাকে ব্যবহার করে অর্থ সরানোর অভিযোগও তদন্তে এসেছে। এর মধ্যে পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে বিদেশে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো, রপ্তানি পণ্যের অর্থ দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া এবং কম মূল্য দেখিয়ে বাকি অর্থ অন্য পথে সরিয়ে নেওয়ার মতো কৌশল ব্যবহারের তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অর্থ পাচারের আরেকটি মাধ্যম হিসেবে বিদেশি কোম্পানির বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে। যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে নজরুল ইসলাম মজুমদারের স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানির তথ্য দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। এসব কোম্পানির মাধ্যমে বিদেশে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সম্পদ কেনার বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জ/উ