রাজধানীতে ছিনতাই এখন আর নির্জন রাতের অপরাধে সীমাবদ্ধ নেই। ভোরের ব্যস্ত সড়ক, দিনের আলো, বাসস্ট্যান্ড, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনের সড়ক কিংবা যানজটে আটকে থাকা গাড়ি—সুযোগ পেলেই ছোবল দিচ্ছে ছিনতাইকারীরা। কখনো চাপাতি ঠেকিয়ে, কখনো চলন্ত রিকশা থেকে ব্যাগ টেনে, আবার কখনো যাত্রী সেজে চালককে অচেতন করে সর্বস্ব লুট করছে সংঘবদ্ধ চক্র।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৭২টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৪০২ জনকে। এর মধ্যে ওয়ারী এলাকায় সবচেয়ে বেশি ৩৮টি এবং তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ৩৪টি মামলা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্র আরও বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ ছিনতাইয়ের সব ঘটনায় মামলা হয় না; অনেক ভুক্তভোগী জিডি করেন, কেউ আবার কোনো অভিযোগই করেন না। জুলাই ও আগস্টের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছিনতাইকারীরা শুধু স্থানই বদলায়নি, বদলেছে তাদের কৌশলও।
জুলাইতেই একের পর এক কৌশল: জুলাইয়ের শুরুতেই ধানমন্ডিতে পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের তৎপরতা সামনে আসে। ২৭ জুন সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে চার ছিনতাইকারী দুই বন্ধুর রিকশার গতিরোধ করে গলায় চাপাতি ঠেকিয়ে দুটি দামি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। বাধা দেওয়ায় একজনকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে ৩ জুলাই অভিযান চালিয়ে ওই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে ধানমন্ডিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করছিল। এর কয়েক দিন পরই সামনে আসে আরও ভয়ংকর কৌশল। ওয়ারী এলাকায় যাত্রী সেজে অটোরিকশাচালকদের অচেতন করে ছিনতাই করছিল একটি চক্র। ২৮ জুন রাতে নিখোঁজ হওয়ার পর অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অটোরিকশাচালক দিদারুল ইসলাম ২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরে সিসিটিভি বিশ্লেষণ করে ৮ জুলাই তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ছিনতাই করা অটোরিকশা, অপরাধে ব্যবহৃত সিএনজি ও মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ, জুলাইয়ের ঘটনাগুলোতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ছিনতাইকারীদের একটি অংশ সরাসরি অস্ত্র দেখিয়ে লুট করছে, আরেকটি চক্র যাত্রী সেজে পরিবহন চালকদের টার্গেট করছে।
আগস্টে প্রাণ গেল প্রধান শিক্ষিকার: আগস্টে ছিনতাইয়ের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে। চোখের চিকিৎসার জন্য স্বামীর সঙ্গে বগুড়া থেকে ঢাকায় আসা প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভীন (৫৬) ২৯ আগস্ট ভোরে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে অটোরিকশায় যাচ্ছিলেন। পেছন থেকে মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি সড়কে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর র্যাব-২ মূল সন্দেহভাজন পনি ওরফে ‘প্যারা পনি’সহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। তবে ব্যাগটি সরাসরি কে টেনেছিল, তা তদন্তে এখনো নিশ্চিত হয়নি। একই সময়ে কদমতলীতে ছিনতাইকারীদের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষে এক ছিনতাইকারী ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে ছিনতাইচক্রের অভ্যন্তরীণ দ্ব›দ্ব এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের আরেকটি দিক সামনে আসে।
যাত্রাবাড়ী যেন আলাদা ‘হটস্পট’: আগস্টে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে যাত্রাবাড়ী-সায়েদাবাদ এলাকা। ৯, ১৬, ১৭ ও ১৮ আগস্ট সরেজমিনে মানুষের সঙ্গে কথা বলে ছিনতাইকারীদের সক্রিয়তার চিত্র পেয়েছে প্রথম আলো। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুযোগ পেলেই ছিনতাই করছে অপরাধীরা; গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে অনেকে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গত ১২ আগস্ট মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে যানজটে থাকা গাড়ির যাত্রীদের সামনে ছিনতাইয়ের চেষ্টা, ১৬ আগস্ট জনপদ মোড়ে দূরপাল্লার বাসের জানালা দিয়ে মোবাইল টেনে নেওয়ার চেষ্টা এবং ১৭ আগস্ট মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে টাকা-মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ—এসব ঘটনা ওই এলাকার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, কাজলারপাড়, চট্টগ্রাম মহাসড়কের অংশ, দোলাইরপাড় ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডকে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ব্যস্ত সড়ক, মানুষের বেশি চলাচল এবং দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব স্থান অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক। ভোর ও সন্ধ্যায় ছিনতাইয়ের ঝুঁকি বেশি বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
গ্রেপ্তার হচ্ছে, তবু থামছে না: ডিএমপির পরিসংখ্যান বলছে, ছয় মাসে ৪০২ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, শুধু গ্রেপ্তার করে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। একই ধরনের চক্র বারবার সক্রিয় হচ্ছে, আবার কিছু অপরাধী জামিনে বেরিয়ে অপরাধে ফিরছে। এখন প্রয়োজন অপরাধপ্রবণ এলাকাভিত্তিক ‘ক্রাইম ম্যাপিং’, সিসিটিভি নজরদারি, মোটরসাইকেলভিত্তিক ছিনতাইকারী চক্র শনাক্তকরণ এবং বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি। একই সঙ্গে ছিনতাইয়ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ জুলাইয়ের চাপাতি, ওয়ারীর অজ্ঞানপার্টি থেকে আগস্টের মোটরসাইকেল ছিনতাই—সবশেষে সংসদ ভবনের সামনে একজন প্রধান শিক্ষিকার মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, রাজধানীতে ছিনতাই এখন শুধু সম্পদহানির অপরাধ নয়; এটি নাগরিকের জীবননিরাপত্তারও বড় হুমকি।
জ/বা