ধর্ম ডেস্ক

ইসলাম ও জীবন

2026-08-24T11:53:02+06:00
2026-08-24T11:53:02+06:00
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলা English
সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
Advertisement
ইসলাম ও জীবন
ভুল সংশোধনে নবীজি (স.)-এর অনন্য শিক্ষা
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৫৩ এএম 
মানুষ মাত্রই ভুল করে। চলাফেরা, কথাবার্তা, কাজকর্ম কিংবা ইবাদত-জীবনের নানা ক্ষেত্রে মানুষের ভুল হতে পারে। কেউ নিজের ভুল বুঝতে পারে, আবার কেউ তা বুঝতে পারে না। তাই ভুল হলে তা সংশোধন করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কীভাবে সংশোধন করা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন থেকে দেখা যায়, তিনি মানুষের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে হিকমাহ, ধৈর্য ও মমতার পরিচয় দিতেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না কাউকে সবার সামনে হেয় করা; বরং ভুলটি দূর করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা।

নাম উল্লেখ না করে ভুল ধরিয়ে দেওয়া

জনসমক্ষে কারও ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে নবীজি (স.)-এর অন্যতম পদ্ধতি ছিল ভুলকারীর নাম প্রকাশ না করা। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, কোনো ব্যক্তির এমন কোনো আচরণ তাঁর কাছে পৌঁছালে যা তিনি অপছন্দ করতেন, অনেক সময় তিনি ওই ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে বলতেন, ‘মানুষের কী হলো যে তারা এমন এমন কথা বলে?’

এভাবে ভুলটি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করা হতো, কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সবার সামনে চিহ্নিত করে বিব্রত করা হতো না। ফলে অন্যরাও ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পেতেন এবং ব্যক্তির মর্যাদাও অক্ষুণ্ন থাকত।

নামাজে ভুল করা সাহাবিকে যেভাবে শেখালেন

এর একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় হজরত মুআবিয়া ইবনে হাকাম আস-সুলামি (রা.)-এর ঘটনায়। একবার তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে তিনি তাকে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলেন।

নামাজের মধ্যে কথা বলা সমীচীন না হওয়ায় উপস্থিত সাহাবিরা তার দিকে তাকাতে থাকেন। তিনি তখন বলেন, ‘কী ব্যাপার, তোমরা আমার দিকে এভাবে তাকাচ্ছ কেন?’ সাহাবিরা নিজেদের উরুতে হাত চাপড়ে তাকে চুপ থাকার ইঙ্গিত দিলে তিনি নীরব হয়ে যান।

নামাজ শেষে রাসুলুল্লাহ (স.) তাকে ডাকলেন। তবে তাকে ধমক দেওয়া হয়নি বা কটু কথা বলা হয়নি। মুআবিয়া (রা.) বলেন, ‘আমি তাঁর আগে ও পরে তাঁর চেয়ে উত্তম কোনো শিক্ষক দেখিনি।’

এরপর নবীজি (স.) তাকে বুঝিয়ে বলেন, নামাজে মানুষের সাধারণ কথাবার্তা বলা সমীচীন নয়। নামাজ হলো তাসবিহ, তাকবির ও কোরআন তেলাওয়াতের সমষ্টি। (সহিহ মুসলিম: ৫৩৭)

এখানে ভুলটি সবার সামনে হলেও সংশোধনের সময় মুআবিয়া (রা.)-কে অপমান করা হয়নি।

শিশুর ভুলেও ছিল মমতা

ছোটদের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও নবীজি (স.) অত্যন্ত কোমল আচরণ করতেন। হজরত ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, ছোটবেলায় তিনি রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে খাবার খাচ্ছিলেন। তিনি থালার বিভিন্ন দিক থেকে হাত বাড়িয়ে খাবার নিচ্ছিলেন।

তখন নবীজি (স.) তাকে বলেন, ‘হে বৎস, আল্লাহর নাম নাও, ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার সামনের অংশ থেকে খাও।’ (সহিহ বুখারি: ৫৩৭৬)

একটি শিশুর খাওয়ার ভুলও তিনি সংশোধন করেছেন, কিন্তু সেই সংশোধনের ভাষায় ছিল মমতা। এতে ভুলটি ঠিক করার পাশাপাশি শিশুটির মর্যাদাও বজায় ছিল।

মসজিদে ভুল করা বেদুইনের ঘটনা

আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে এক বেদুইনের ক্ষেত্রে। ওই ব্যক্তি মসজিদের ভেতরে প্রস্রাব করতে শুরু করলে সাহাবিরা তাকে থামাতে এগিয়ে যান। রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের বাধা দেন এবং লোকটিকে প্রস্রাব শেষ করতে দেন।

এরপর তিনি তাকে বুঝিয়ে বলেন, মসজিদ প্রস্রাব বা ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থান নয়; এটি আল্লাহর জিকির, নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াতের জায়গা। (সহিহ মুসলিম: ২৮৫)

এ ক্ষেত্রেও ভুলটি সবার চোখের সামনে ঘটেছিল। কিন্তু নবীজি (স.) পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ না করে প্রথমে তা সামাল দেন এবং পরে ওই ব্যক্তিকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন।

প্রয়োজনে প্রকাশ্যেও সংশোধন

তবে এর অর্থ এই নয় যে, নবীজি (স.) কখনো প্রকাশ্যে ভুল সংশোধন করেননি। কোনো ভুল প্রকাশ্য হলে বা কোনো বিষয় সম্পর্কে সবার জানা প্রয়োজন হলে তিনি জনসমক্ষেও তা পরিষ্কার করেছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী দৃঢ়তাও দেখিয়েছেন।

হজরত আয়েশা (রা.) একটি ছবি থাকা বালিশ ঘরে নিয়ে এলে রাসুলুল্লাহ (স.) তা দেখে অসন্তুষ্ট হন এবং ঘরে প্রবেশ করেননি। পরে তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে দেন এবং প্রাণীর ছবি সম্পর্কে সতর্ক করেন। (সহিহ বুখারি: ৫১৮১)

অর্থাৎ ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় একই পদ্ধতি অনুসরণ করেননি। কখন ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে সংশোধন করতে হবে, কখন সরাসরি বুঝিয়ে বলতে হবে এবং কখন দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে-পরিস্থিতি অনুযায়ী সে পদ্ধতিই গ্রহণ করেছেন।

ভুলের প্রতিবাদ, মানুষের অপমান নয়

তাই নবীজি (স.) সবার সামনে কারও ভুল ধরিয়ে দিতেন কি না-এর উত্তর এককথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়। তিনি প্রয়োজনে প্রকাশ্যেই ভুল সংশোধন করেছেন, তবে কাউকে অপদস্থ করার উদ্দেশ্যে নয়। ব্যক্তিগত ভুল হলে অনেক সময় ব্যক্তির নাম উল্লেখ না করে তা সংশোধন করেছেন। আবার প্রকাশ্য ভুলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ্যেই বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন।

বর্তমান সময়ে আমরা অনেক সময় ভুল ধরিয়ে দেওয়ার নামে মানুষকেই ছোট করে ফেলি। পরিবারে সন্তান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী, কর্মক্ষেত্রে সহকর্মী কিংবা সমাজের পরিচিত কেউ ভুল করলে তাকে সবার সামনে অপমান করার প্রবণতা দেখা যায়। এতে অনেক সময় ভুল সংশোধনের চেয়ে মানুষের আত্মমর্যাদায় আঘাতটাই বড় হয়ে ওঠে।

নবীজি (স.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা হলো—ভুলের বিরুদ্ধে দৃঢ় হতে হবে, কিন্তু ভুলকারী মানুষের মর্যাদাও রক্ষা করতে হবে। এমনভাবে ভুল বুঝিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের ভুল উপলব্ধি করতে পারেন, সংশোধনের সুযোগ পান এবং অপমানিত হয়ে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে না যান।

নবীজি (স.) ভুল দেখলে মানুষকে ভেঙে দিতেন না, বরং গড়ে তুলতেন। তাঁর সংশোধনে ভুলের প্রতিবাদ ছিল, কিন্তু মানুষের অপমান ছিল না।






Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম ও জীবন - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]