মসজিদ মুসলিম সমাজের প্রাণকেন্দ্র। মদিনার মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করেই ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এবং ইসলামের মহান চার খলিফা মসজিদের মিম্বার থেকেই মুসলিম জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে মুসলিম সমাজে মসজিদের ইমামের দায়িত্ব ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ‘মহানবী (সা.)-এর ইমামতি ও খুলাফায়ে রাশেদার ইমামতি শাসক ও বিচারকের মতো মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব ছিল।’ (শরহু উমদাতিল ফিকহ, পৃষ্ঠা-১৩৯)।
ইমামের সম্মান ও মর্যাদা
কোরআন ও হাদিসে ইমামের মর্যাদা ও দায়িত্বের বিষয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
ইমামতি আল্লাহর অনুগ্রহ: ইমাম বা মানুষের ধর্মীয় নেতা হওয়াকে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর প্রতি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানুষের ইমাম বানিয়েছি।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১২৪)। এ আয়াতে সামগ্রিক ধর্মীয় নেতৃত্ব বোঝানো হলেও এর আওতায় নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের নেতৃত্বও অন্তর্ভুক্ত।
প্রার্থিত বিষয়: মুসল্লি ও দ্বিনদার মানুষের ইমাম বা নেতা হওয়াও মুমিনদের প্রার্থনার অংশ। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের দোয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো, যারা হবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদের করো মুত্তাকিদের জন্য ইমাম (অনুসরণযোগ্য)।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)।
মহানবী (সা.)-এর উৎসাহ: মহানবী (সা.) ইমামতির দায়িত্ব পালনে উৎসাহ দিয়েছেন। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে একটি আমলের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তুমি তোমার গোত্রের ইমাম হও।’ লোকটি সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করলে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তবে তুমি তাদের মুয়াজ্জিন হও।’ (শরহু উমদাতিল ফিকহ, পৃষ্ঠা-১৩৯)।
পরকালে পুরস্কার: মানুষের নামাজের ইমামতির জন্য আখিরাতে পুরস্কারের কথাও হাদিসে এসেছে। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কিয়ামতের দিন তিন ধরনের ব্যক্তি মিসকের (সুগন্ধির) টিলায় থাকবে। এক. সেই দাস, যে আল্লাহর হক আদায় করে নিজ মনিবের হকও আদায় করেছে; দুই. সেই ব্যক্তি, যে মানুষের নামাজের ইমামতি করেছে আর মানুষ তার ওপর সন্তুষ্ট রয়েছে; তিন. সেই ব্যক্তি, যে দিনরাত সব সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য আজান দিয়েছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৫৬৬)।
ইমাম হওয়ার শর্ত
ফকিহ আলেমরা নামাজের ইমাম হওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—
১. মুসলিম হওয়া: কোনো অমুসলিম মুসলমানদের নামাজের ইমামতি করতে পারবেন না। একইভাবে ঈমানের পরিপন্থী কোনো ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তির ইমামতিও বৈধ নয়, যদিও তিনি নিজেকে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন।
২. বালেগ হওয়া: অধিকাংশ ইমামের মতে, নাবালক শিশু ফরজ নামাজের ইমামতি করতে পারে না। তবে নামাজের মাসআলা সম্পর্কে জ্ঞান ও বোঝাপড়া থাকলে নফল বা সুন্নত নামাজের ইমামতি করতে পারে। যেমন—তারাবির নামাজ।
৩. পুরুষ হওয়া: ইমামতির দায়িত্ব পুরুষের জন্য নির্ধারিত। তাই নারীর ইমামতি শুদ্ধ নয়।
৪. সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া: মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির জন্য নামাজের ইমামতি করা বৈধ নয়।
৫. কিরাত শুদ্ধ হওয়া: ইমাম হওয়ার অন্যতম প্রধান যোগ্যতা হলো কোরআন তিলাওয়াত বা কিরাত শুদ্ধ হওয়া। যার কিরাত শুদ্ধ নয়, তার পেছনে নামাজ পড়া বৈধ নয়। আর যিনি অধিক শুদ্ধভাবে কিরাত পড়তে পারেন, ইমামতির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রাধিকার পাবেন।
৬. পবিত্রতা: ইমামের দেহ ও পোশাক পবিত্র থাকা আবশ্যক।
৭. শারীরিকভাবে সক্ষম হওয়া: এমন কোনো রোগ বা শারীরিক সমস্যা থাকলে, যার কারণে নামাজের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তার ইমামতি বৈধ নয়। যেমন—সব সময় প্রস্রাব বের হওয়া, দাঁড়ানো, রুকু বা সিজদা করতে অক্ষম হওয়া। মুখের জড়তার কারণে আরবি হরফ শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে না পারলেও ইমামতি বৈধ নয়। (আল ফিকহু আলা মাজাহিবিল আরবাআ : ১/৩৭১)।
ইমামের বাড়তি যোগ্যতা
উল্লিখিত মৌলিক শর্তের পাশাপাশি প্রাজ্ঞ আলেমরা ইমামের আরও কিছু গুণ থাকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন।
আলেম হওয়া: একজন ইমামের সামগ্রিক ধর্মীয় জ্ঞান থাকা জরুরি। কারণ তিনি সমাজের ধর্মীয় নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মানুষের বিভিন্ন ধর্মীয় সমস্যার সমাধানেও ভূমিকা রাখেন। তাই ইমাম নিজে পর্যাপ্ত জ্ঞান না রাখলে অন্যদের বিভ্রান্ত করার আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে ইমাম মুফতি হলে তা আরও উত্তম।
আল্লাহভীরু হওয়া: মসজিদের ইমাম হিসেবে আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘তারাই আল্লাহর মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ ও আখিরাতে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং শুধু আল্লাহকে ভয় করে। অতএব, আশা করা যায়, তারা হবে সত্প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১৮)।
মধ্য বয়সী হওয়া: মসজিদের ইমাম মধ্য বয়সী হওয়া উত্তম বলে আলেমরা মত দিয়েছেন। তাঁদের মতে, তরুণদের মধ্যে নানা ধরনের অস্থিরতা থাকতে পারে, আবার অতিবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে সামাজিক নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ বিষয়ে নবীদের ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভের বিষয়টিকেও আলেমরা দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইমামের সামাজিক দায়িত্ব
ইসলামী জীবনব্যবস্থায় ইমামের দায়িত্ব শুধু নামাজ পড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি সমাজের মানুষের কল্যাণ, নৈতিক উন্নয়ন ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রের আনুকূল্যে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সুপথ দেখানো
মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা ইমামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় দেখা দিলে মানুষকে সঠিক পথের নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর আমি তাদের মধ্যে থেকে ইমাম (নেতা) মনোনীত করেছিলাম, যারা আমার নির্দেশ অনুসারে পথপ্রদর্শন করত, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আর তারা ছিল আমার নিদর্শনাবলিতে দৃঢ় বিশ্বাসী।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ২৪)।
ধর্মীয় জ্ঞানের প্রসার
ইমাম মুসলিম সমাজের একজন শিক্ষকও। তাই মানুষের মধ্যে ধর্মীয় জ্ঞানের বিস্তার ঘটানো তাঁর দায়িত্বের অংশ। বর্তমানে সাধারণ মানুষের একটি অংশ ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে রয়েছে এবং অনেক শিশুও ধর্মীয় শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এ কারণে মানুষ যাতে সহজে ফরজ জ্ঞান অর্জন করতে পারে, সেদিকে ইমামের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
ইমামের উচিত বয়ান ও আলোচনায় ধর্মীয় জ্ঞান, বিশেষ করে ফরজ জ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া। বিভিন্ন সুযোগে মসজিদে জ্ঞানচর্চার আয়োজন করেও মানুষের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে।
অপরাধ ও অন্যায়ের প্রতিবাদ
সমাজে কোনো পাপ, অপরাধ বা অন্যায় বিস্তার লাভ করলে তার বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করাও ইমামের দ্বিনি দায়িত্ব। ব্যক্তিগত বা সামাজিক সংকটের আশঙ্কা থাকলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত না করে অন্যায় ও পাপের বিরুদ্ধে সাধারণভাবে সতর্ক করা যেতে পারে।
আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদের পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত দেবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহর ইচ্ছাধীন।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৪১)।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করা
সমাজের ধর্মীয় নেতা হিসেবে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতি বজায় রাখতেও ইমামের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরতকারী মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পারিবারিক বা সামাজিক কারণে দুই ব্যক্তি, দুই পরিবার কিংবা দুটি মহল্লার মধ্যে বিরোধ বা মনোমালিন্য তৈরি হলে ইমাম প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকে তা নিরসনের উদ্যোগ নিতে পারেন।
আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই; সুতরাং তোমরা ভাইদের ভেতর শান্তি স্থাপন করো আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)।
সেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ
একজন আদর্শ ইমাম শুধু সমাজের কাছ থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করবেন না; বরং সমাজের অসহায় ও পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া, সংকট চিহ্নিত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া তাঁর সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
প্রয়োজনে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতা নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেতে পারে। মহানবী (সা.) নিয়মিত সমাজের দুস্থ ও অসহায় মানুষের খোঁজখবর নিতেন। এমনকি কেউ নামাজের জামাতে অনুপস্থিত থাকলেও তিনি তার বাড়িতে গিয়ে অনুপস্থিতির কারণ জানার চেষ্টা করতেন।
অতএব, একজন ইমাম শুধু মসজিদের নামাজ পরিচালনাকারী নন; তিনি সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক নেতৃত্বেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামী শিক্ষায় নেতৃত্বকে মানুষের সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘গোত্রের নেতা তাদের সেবক।’ (সিলসিলাতুদ দয়িফা, হাদিস : ১৫০২)।
জ/উ