৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ

জবাবদিহি ডেস্ক

জাতীয়

একটি স্বাধীন, স্বনির্ভর ও নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই দেশ নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা, দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। হাজারো মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হন, স্থবির হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

2026-11-07T08:16:39+06:00
2026-11-07T08:29:59+06:00
শনিবার ● ৭ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
জাতীয়
৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ
জবাবদিহি ডেস্ক
⏲ ৮:১৬ এএম | ৭ নভেম্বর, ২০২৬ | শনিবার
সংগৃহীত ছবি
একটি স্বাধীন, স্বনির্ভর ও নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই দেশ নানা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা, দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ এবং সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। হাজারো মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হন, স্থবির হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

সদ্য স্বাধীন দেশে দুঃশাসন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় দিশেহারা হয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের সহিংস রাজনীতি। এমন এক সংকটময় সময়ে দেশের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। চারদিকে হতাশা, ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে ১৯৭৫ সালের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে সামনে আসে ৭ নভেম্বর।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব নিয়ে রয়েছে নানা বিশ্লেষণ ও মতভেদ। তবে দিনটিকে শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করলে এর দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা ও অর্থনৈতিক নীতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে অনেকেই সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেন। ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিস্থিতির সূচনা হয়েছিল, ৭ নভেম্বর তা নতুন মোড় নেয়।

৩ নভেম্বর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তিন ব্যক্তির—সামরিক কর্মকর্তা ও স্বল্প সময়ের সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফ, জাসদ নেতা কর্নেল আবু তাহের এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের। তবে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে সিপাহী ও জনতার সমর্থন নিয়ে জিয়াউর রহমানই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন। অন্যদিকে খালেদ মোশাররফ ও কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল বিভাজন ও অস্থিরতায় পূর্ণ। বাকশাল ব্যবস্থা, রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ এবং বিভিন্ন দলের সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন জিয়াউর রহমান।

মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার কারণে জিয়াউর রহমানের প্রতি সাধারণ মানুষের একটি অংশের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও জাসদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও ছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করার অভিযোগ এবং জাসদের বিরুদ্ধে জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতির অভিযোগ জনমনে অসন্তোষ বাড়িয়েছিল।

ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাসদের এককভাবে অভ্যুত্থান সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এই প্রেক্ষাপটে কর্নেল তাহের ও জাসদের একটি অংশ জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন—এমন বিশ্লেষণও রয়েছে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিপাহী-জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমান সামনে চলে আসেন। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে চলে যায়। তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার কাছে কর্নেল তাহেরের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ৭ নভেম্বরের পর দেশের রাজনীতিতে জাসদের প্রভাব ও সম্ভাবনাও অনেকটাই সংকুচিত হয়।

এরপর জিয়াউর রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল করার উদ্যোগ নেন। বাকশালের কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সরে এসে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে উদার বাজারব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হন। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনীতির দুয়ার উন্মুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হয়। এসব সংস্থার মাধ্যমে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ উন্নয়ন সহযোগিতার অর্থ আসে। এর ফলে এনজিও খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই সময়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমেরও বিকাশ ঘটে।

বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তা আকর্ষণেও জিয়াউর রহমানের সরকার গুরুত্ব দেয়।

অর্থনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন আসে। বাকশাল ব্যবস্থায় বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগ নিজ নামে রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়। একই সময়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে ফেরার পথও উন্মুক্ত হয়। জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন মত ও পথের মানুষকে রাষ্ট্র গঠনের কাজে যুক্ত করা। রাজনৈতিক বিভেদ পেছনে ফেলে জাতীয় স্বার্থে সবাইকে একত্র করার উদ্যোগকে তাঁর শাসনামলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচনা করেন সমর্থকেরা।

এ কারণে ৭ নভেম্বরকে অনেকে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তাঁদের দৃষ্টিতে, এই ঐক্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

জিয়াউর রহমান যখন দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন, তখন বিশ্বজুড়েও চলছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা। বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। ব্রাজিলে চলছিল সামরিক শাসন। চিলিতে সালভাদর আয়েন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতায় এসেছিলেন অগুস্তো পিনোশে। আর্জেন্টিনায় শুরু হয়েছিল হোর্হে ভিদেলার সামরিক শাসন। আফ্রিকার লিবিয়া ও মিসরেও সামরিক শাসকেরা রাষ্ট্র পরিচালনা করছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যের সিরিয়া ও ইরাকেও সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রভাব ছিল প্রবল।

এমন বৈশ্বিক বাস্তবতায় সামরিক বাহিনী থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তাঁর সমর্থকদের মতে, অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করে তিনি দেশকে দ্রুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের বিবেচনায়, স্বাধীনতার পর বহুদলীয় রাজনৈতিক চর্চা পুনরায় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সামরিক কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে বিপর্যস্ত জাতিকে প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন। সেই ঐতিহাসিক ভূমিকা ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার ধারাবাহিকতায় ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তিনি নেতৃত্বের কেন্দ্রে চলে আসেন।

সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমাত্রিক ঘটনা। এ দিনের ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও ইতিহাস বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে এর প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। সমর্থকদের কাছে দিনটি জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও স্বাধীন-স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের নতুন যাত্রার প্রতীক। তাঁদের দৃষ্টিতে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ৭ নভেম্বরই দেশের মানুষকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল।

জ/শা 


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত