নির্বাচনে ভরাডুবির পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের মিত্রদের সুর পরিবর্তন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

2026-11-06T08:57:47+06:00
2026-11-06T08:57:47+06:00
শুক্রবার ● ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২১ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
আন্তর্জাতিক
নির্বাচনে ভরাডুবির পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের মিত্রদের সুর পরিবর্তন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
⏲ ৮:৫৭ এএম | ৬ নভেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবার
সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের ইরানবিরোধী রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ—যুদ্ধের স্থায়িত্ব, ব্যয় ও পরিণতি নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকান নেতারা ট্রাম্পের অবস্থান থেকে নিজেদের কিছুটা দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনের পরদিন বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ পোস্টে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ যুদ্ধ। প্রেসিডেন্ট নিজেই গত রাতে তা বলেছেন।’

২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এবং ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স প্রশ্ন তুলেছেন, যুদ্ধের কারণে রাজনৈতিকভাবে যে মূল্য দিতে হয়েছে, তা কতটা যৌক্তিক ছিল।

তিনি লেখেন, ‘কেউ যদি মনে করেন, এর বিনিময়ে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো সার্থক ছিল, তাহলে সে যুক্তি তুলে ধরতে পারেন।’

অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘদিনের সমর্থক সিনেটর টেড ক্রুজও এবার সমালোচনার সুরে কথা বলেছেন। বুধবার নিজের পডকাস্টে তিনি বলেন, যুদ্ধটি ‘স্বল্পস্থায়ী, চূড়ান্ত এবং শেষ হয়ে যাওয়ার মতো’ হওয়া উচিত ছিল।

এক্সে দেওয়া আরেক পোস্টে ক্রুজ বলেন, যুদ্ধ ‘অনেক বেশি দীর্ঘায়িত হয়েছে’। তবে ইরানকে কোনোভাবেই ‘কয়েকশ কোটি ডলার’ দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ক্রুজের এই বক্তব্যের ইঙ্গিত গত জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের দিকে। এতে যুদ্ধ-পরবর্তী ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলসহ কয়েকটি বিষয় আলোচনার জন্য রাখা হয়েছিল। প্রস্তাবটি নিয়ে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা হয়। তাঁদের অভিযোগ ছিল, এর মাধ্যমে ইরান সরকারকে বিপুল অর্থ দেওয়া হবে। তবে যুদ্ধবিরতির পথ তৈরির লক্ষ্যে নেওয়া ওই সমঝোতা দ্রুতই ভেঙে পড়ে।

ট্রাম্প অবশ্য ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত নন। চলতি সপ্তাহে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমি সঠিক কাজ করেছি। আবারও একই কাজ করতাম।’

বুধবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভ্যান্সের মূল্যায়নকে ‘অনেকাংশে সত্য’ বলে স্বীকার করেন ট্রাম্প। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোটাররা রিপাবলিকানদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল বলে দাবি করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

২০২৮ সালের নির্বাচন ঘিরে রিপাবলিকানদের হিসাব

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে ২০২৮ সালের নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার তৎপরতা শুরু হয়েছে।

জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি ইন কাতারের সরকারবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল-জাজিরাকে বলেন, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হয়েছে।

তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। এ পর্যন্ত যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের আনুমানিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী রিপাবলিকান নেতাদের জন্য যুদ্ধ থেকে নিজেদের দূরত্ব তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মাসগ্রেভ মনে করেন, টেড ক্রুজের মতো কট্টর ইরানবিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশটিতে সামরিক অভিযানের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি তাঁদের জন্য জটিল হয়ে উঠেছে। তাঁরা সরাসরি যুদ্ধের বিরোধিতা করতে পারছেন না; বরং যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও পরিচালনাপদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করে নিজেদের অবস্থান সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে, জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান পার্টির তুলনামূলক বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর বড় অংশের সমর্থন পেতে তিনি যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন বলে মনে করেন মাসগ্রেভ।

ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এসেক্সের সরকারবিষয়ক অধ্যাপক নাতাশা লিন্ডস্টেড বলেন, ভ্যান্স শুরু থেকেই ইরান যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না। অথচ এখন তাঁকেই যুদ্ধের অবসান নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে আসছে।

সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল কর্মকর্তা জন ফিহেরিও বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ অন্যতম বড় কারণ। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা ও দুর্নীতির বিষয়গুলোও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।

তাঁর মতে, ট্রাম্পের উত্তরসূরি হওয়ার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে জেডি ভ্যান্স ও ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিসের নাম আলোচনায় রয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধে কী করতে পারে ডেমোক্র্যাটরা

কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ বরাদ্দ সীমিত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের সামনে।

বুধবার সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার বলেন, ‘এই যুদ্ধের অবসান হওয়া প্রয়োজন।’ যুদ্ধের অর্থায়নের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে শুমার বলেন, মার্কিন সংবিধান প্রণেতারা কংগ্রেসের হাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা দিয়েছিলেন, যাতে জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শুরু করলে তা ঠেকানো যায়।

কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর যেকোনো যুদ্ধ কার্যক্রমে অর্থায়ন বন্ধে একটি প্রস্তাব আনার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতোই এই যুদ্ধের অবসান ঘটানো উচিত।

অধ্যাপক পল মাসগ্রেভের মতে, যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা বাজেটের অর্থ বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি কংগ্রেসের শুনানি ও তদন্তের মাধ্যমে যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।

এদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস সিবিএস নিউজকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধে ভূমিকার জন্য হেগসেথকে ‘জবাবদিহির মুখে’ পড়তে হবে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো তাঁকে ‘অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তবে মাসগ্রেভ সতর্ক করে বলেন, কংগ্রেসের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মেনে নিতে ট্রাম্প প্রশাসনের অনীহা থেকে আরও বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, যুদ্ধক্ষমতা আইন নিয়ে বিরোধের চেয়েও এই বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতিও অব্যাহত

কূটনৈতিক উদ্যোগ ও কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চললেও ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি থেমে নেই।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। জুনের পর ওই এলাকায় এটিই ছিল প্রথম হামলা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এ পদক্ষেপকে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, বুধবার থেকেই শুরু হতে পারে—এমন হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে দেশটির সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড। ওই সময় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি থাকার কথা।

গালফ স্টেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরো বলেন, ট্রাম্প সবাইকে, এমনকি ইরানকেও অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখতে পছন্দ করেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ায় ট্রাম্পের মনে হতে পারে, তাঁর হারানোর আর কিছু নেই। সে ক্ষেত্রে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ আরও জোরদার করতে পারেন তিনি।

তবে নির্বাচনে জয়ী ডেমোক্র্যাটরা ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন না। কাফিয়েরোর মতে, ট্রাম্প এই সময়কে ইরানের বিরুদ্ধে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। অন্যদিকে, যেকোনো হামলার জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার ইতোমধ্যে করেছে তেহরান।

সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চলছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনো আলোচনার প্রক্রিয়ায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের শর্তের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অবস্থানকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে মন্তব্য করেছে তেহরান।

জর্জিও কাফিয়েরোর মতে, দুই পক্ষ মূল ইস্যুগুলোতে সমঝোতায় পৌঁছাতে রাজি হলেই কাতারের মধ্যস্থতা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ইসরায়েল সম্ভাব্য যেকোনো কূটনৈতিক সমঝোতা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, নির্বাচনের রাতে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, আপাতত নতুন করে হামলার নির্দেশ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, এপি নিউজ।

জ/শা 


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত