জুমার দিন মুসলমানদের জন্য সাপ্তাহিক ঈদের দিন। এ দিনের প্রতিটি মুহূর্তে রয়েছে আল্লাহর রহমত ও বরকত লাভের বিশেষ সুযোগ। তাই জুমার দিনে কোরআন তিলাওয়াত হতে পারে মুমিনের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।
মানুষের হৃদয় অবহেলা, গুনাহ ও দুনিয়ামুখী ব্যস্ততার কারণে ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত সেই হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বালাতে এবং প্রশান্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
কোরআন তিলাওয়াতে দূর হয় হৃদয়ের মরিচা
মানুষের অন্তরেও মরিচা পড়ে। গুনাহ, অহংকার, দুনিয়ার মোহ এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকার কারণে অন্তরের সেই মরিচা আরও গভীর হয়।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এসব অন্তরে মরিচা ধরে, যেমন পানির সংস্পর্শে লোহায় মরিচা ধরে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! তা দূর করার উপায় কী?’ তিনি বলেন, ‘মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা এবং কোরআন তিলাওয়াত করা।’ (বায়হাকি, মিশকাতুল মাসাবিহ)
জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠের ফজিলত
জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা। এ সুরা পাঠের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত একটি নূর আলোকিত থাকবে।’ (মুস্তাদরাকে হাকেম)
অর্থাৎ জুমার দিনে সুরা কাহফ পাঠের মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নূর লাভের আশা করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইসলামি ফিকহের আলোচনা অনুযায়ী জুমার দিন বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকেই শুরু হয় এবং শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। ফলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই সুরা কাহফ তিলাওয়াত করা যায়।
দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষায় সুরা কাহফ
সুরা কাহফের প্রথম ১০ আয়াতের সঙ্গে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।
হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সুরা আল-কাহফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করবে, সে দাজ্জালের ফিতনা থেকে সুরক্ষিত থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮০৯)
অন্য একটি বর্ণনায় সুরা কাহফের শেষ ১০ আয়াতের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তাই সম্ভব হলে একজন মুসলমানের প্রথম ও শেষ ১০ আয়াত মুখস্থ করার চেষ্টা করা উচিত। তবে শুধু মুখস্থ করাই নয়, আয়াতগুলোর অর্থ বোঝা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন পরিচালনার চেষ্টাও গুরুত্বপূর্ণ।
কোরআন দেখে পড়া নাকি মুখস্থ পড়া উত্তম
কোরআন মুখস্থ তিলাওয়াত করা নিঃসন্দেহে মহৎ ইবাদত। একই সঙ্গে দেখে দেখে কোরআন পড়ারও বিশেষ মর্যাদা রয়েছে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
তবে কোরআন দেখে পড়লে মুখস্থ পড়ার তুলনায় দ্বিগুণ থেকে দুই হাজার গুণ সওয়াব পাওয়া যায়—এমন প্রচলিত বক্তব্যকে নিশ্চিত ও সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মূল বিষয় হলো, কোরআন শুদ্ধভাবে, আদবের সঙ্গে এবং মনোযোগ দিয়ে তিলাওয়াত করা। পাশাপাশি আয়াতগুলোর অর্থ ও তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করা।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসার আশা করে যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ২৯)
কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার চেষ্টা
পবিত্র কোরআন মানুষের জীবন পরিচালনার জন্য নাজিল করা হয়েছে। তাই শুধু কোরআনের আয়াত তিলাওয়াত করাই যথেষ্ট নয়; এর অর্থ অনুধাবন, শিক্ষা গ্রহণ এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করাও জরুরি।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯)
তাই প্রতি বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়কে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বের করে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন ও তা নিয়ে চিন্তাভাবনায় ব্যয় করা উচিত।
দুনিয়ার ব্যস্ততা একসময় শেষ হবে, জীবনও একদিন ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু পবিত্র কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ে তুলতে পারলে তা পরকালীন জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের কোরআন তিলাওয়াত করা, এর অর্থ বোঝা, শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা এবং জুমার দিনের বরকতময় আমলগুলো যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
জ/শা