রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব হবে না বলে মন্তব্য করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর মতে, এ ব্যবস্থার আওতায় আসা ডিজেলের পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জ্বালানির দামে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলার জন্য যথেষ্ট নয়। তবে এর ফলে রাশিয়া যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করার জন্য বিপুল অর্থ পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওকে (এনপিআর) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি এসব কথা বলেন। এনপিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে সতর্ক অবস্থান নেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, এর পরিমাণ যথেষ্ট নয়।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির বাজারে প্রত্যাশিত প্রভাব পড়বে না। অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা দিতে পারে।
ট্রাম্পের রোববারের ঘোষণার পর থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার কোনো তেল শোধনাগারে হামলা চালায়নি বলেও জানান জেলেনস্কি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ হয়নি। তবে এ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছিল।
জেলেনস্কি বলেন, ‘আমার জেনারেলরা আমাকে জানিয়েছেন, সামরিক পর্যায়ে তাঁদের এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল।’
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহাও জানিয়েছেন, কিয়েভ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে। তাঁর মতে, এবার আগাম সতর্কবার্তা না পাওয়ার বিষয়টি রাশিয়ার ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সামরিক সরঞ্জাম, জনবল ও সম্পদের দিক থেকে রাশিয়ার তুলনায় পিছিয়ে থাকা ইউক্রেনের জন্য রুশ তেল শোধনাগারে হামলা মস্কোর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমানোর অন্যতম কৌশল হয়ে উঠেছে। তবে ট্রাম্প বারবার যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য ইউক্রেনের এসব হামলাকে দায়ী করেছেন।
রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি স্থগিতের সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে দাবি করে আসছেন ট্রাম্প। আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠেয় মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ পরিস্থিতি তাঁর রিপাবলিকান পার্টির জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
তবে অধিকাংশ বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধ জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে আরও বড় ভূমিকা রেখেছে। এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কিও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সবাই বিষয়টি বোঝে।’
এর আগে, গত সোমবার (১২ অক্টোবর) ইউক্রেনের ছয়টি জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায় রাশিয়া।
জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে জানতে চাইলে ক্রেমলিনের এক মুখপাত্র জানান, এ বিষয়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হননি।
এদিকে, গতকাল মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি জানান, সংঘাত নিরসনের উপায় নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নতুন বৈঠকের লক্ষ্যে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইউক্রেন।
সম্ভাব্য ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
জেলেনস্কি বলেন, রাশিয়া যুদ্ধবিরতি মেনে চললে জ্বালানি খাতে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে ট্রাম্পের ঘোষণাকে সমর্থন করে ইউক্রেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শান্তির জন্য কাজ করতে হবে, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার উপায় খুঁজতে হবে। ইউক্রেন বৈঠকের জন্য প্রস্তুত।’
এর আগে জেলেনস্কি জানিয়েছিলেন, উত্তেজনা কমাতে পারস্পরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত কিয়েভ। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য অংশীদার দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়। ওই বৈঠক সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাশিয়াকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রুশ ডিজেল রপ্তানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন উইটকফ ও কুশনার।
এদিকে, ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে আগাম সতর্কতা দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্রদের সহায়তা দিয়ে ওয়াশিংটনের সক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন নরওয়ের ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজের ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফ্যাবিয়ান হফম্যান।
তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালিত ‘স্পেস-বেজড ইনফ্রারেড সিস্টেম’-এর ওপর নির্ভর করে। তাঁর ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যবস্থার তুলনা হয় না, আর কেবল যুক্তরাষ্ট্রই এ ধরনের সক্ষমতা দিতে পারে।’
রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধকে ইউক্রেনের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা।
এ প্রসঙ্গে গত বছর হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির উত্তপ্ত বৈঠকের কথা উল্লেখ করেন তিনি। ওই বৈঠকে ট্রাম্প জেলেনস্কিকে বলেছিলেন, তাঁর হাতে কোনো ‘কার্ড’ নেই। অর্থাৎ, আলোচনায় এগিয়ে যাওয়ার মতো যথেষ্ট সুবিধা তাঁর নেই।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুই দেশের অবস্থান আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।