ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন হয়তো সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্বীকার করেছেন, ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারেন—এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। খবর আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আইয়ের।
ওহাইওর ইয়ংসটাউনে এক নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা হয়তো ইরানের নেতাদের ওপর আঘাত হানার ক্ষেত্রে একটু বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। কারণ সত্যি বলতে, আমরা এখন আর বুঝতেই পারছি না যে কার সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছি। সত্যি কথা বলতে, কার সঙ্গে চুক্তি বা আলোচনা করতে হবে, তা বের করতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমার মনে হয়, আমরা একটু বেশিই দূরে চলে গেছি।’
বক্তব্যের একপর্যায়ে ট্রাম্প দাবি করেন, এখন আর কেউ ইরানের প্রেসিডেন্ট হতে চান না। তবে দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজের সামরিক অভিযানের সাফল্য তুলে ধরে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, ইরান তার পুরো বিমানবাহিনী এবং ১৫৯টি নৌযান হারিয়েছে। তাঁর ভাষায়, জাহাজগুলো এখন সমুদ্রের তলদেশে ‘খুব সুন্দরভাবে বিশ্রাম নিচ্ছে’।
রাশিয়া-চীনের সহায়তার খবর নাকচ ট্রাম্পের
ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে রাশিয়া ও চীন সহায়তা করছে—এমন খবর প্রত্যাখ্যান করেছেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘তারা যদি সাহায্য করেই থাকে, তবে সেটি অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ের। তবে আমি একদমই বিশ্বাস করি না যে তারা কোনো সাহায্য করছে। কারণ, এতে তাদের হারানোর মতো অনেক কিছু আছে এবং তারা সাহায্য করলে সেটি আমরা খুব দ্রুতই জেনে যেতাম।’
প্রতিবেশী আরব দেশগুলোয় স্থল হামলার পরিকল্পনা ইরানের
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও হামলা চালাতে পারে মার্কিন বাহিনী—এমন আশঙ্কায় নিজেদের পারমাণবিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করছে তেহরান। একই সঙ্গে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে স্থল হামলার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান নতুন করে হামলার শিকার হলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে স্থল অভিযান চালানোর পরামর্শ দিয়েছেন দেশটির কট্টরপন্থি রাজনীতিবিদেরা।
এ ছাড়া মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান সতর্ক করেছে, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে তাদের পাল্টা জবাব আরও আগ্রাসী হবে। এর অংশ হিসেবে ব্যাপক হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করা হতে পারে।
প্রতিবেদনে ইরান কোন দেশে সরাসরি সেনা পাঠাতে পারে, তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি। তবে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম উঠে এসেছে।
হরমুজ প্রণালিতে শাটল জাহাজে হামলার হুমকি
ইরানের অবরোধ এড়িয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো নতুন একটি শাটল পরিবহনব্যবস্থা চালু করেছে। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় পরিচালিত আরব দেশগুলোর এই তেল পরিবহনব্যবস্থা এখন ইরানের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু।
রেজাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহায়তায় ছোট ছোট জাহাজে তেল নিয়ে হরমুজ প্রণালির বাইরে অবস্থানরত বড় ট্যাঙ্কারে তা স্থানান্তর করা হচ্ছিল।
এ কার্যক্রমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘আপনারা চোরাচালান করছেন; কিন্তু মনে রাখবেন, এই প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং আমরাই এটি পরিচালনা করছি।’
রেজাই আরও হুঁশিয়ারি দেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনা কিংবা জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা হলে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আরব অঞ্চলের ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হতে পারে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও এবং উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৯টি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে ইরান।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তাদের নির্ধারিত নিয়ম না মেনে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং ডুবিয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
জ/শা