খাবারের দোকানে হামলার ছক, দুই বাহিনীতে লোক

খন্দকার হানিফ রাজা

অপরাধ

দুপুরে খাবারের দোকানে বৈঠক, বিকেলে দুই এলাকায় লোক জড়ো, সন্ধ্যার পর পাঁচ পিকআপে ও হেঁটে অস্ত্র হাতে রওনা—আর রাত সাড়ে ১০টায় নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা। প্রায় ২০০ মানুষের এই সশস্ত্র তাণ্ডবের একপর্যায়ে গুলির নিশানা করা হয় ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া ছয় পুলিশ সদস্যকেও। রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে গত ২৬ সেপ্টেম্বরের হামলার তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, ৩৫ কাঠা জমি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধ থেকেই তৈরি হয় হামলার পরিকল্পনা।

2026-10-05T21:14:25+06:00
2026-10-05T21:14:57+06:00
সোমবার ● ৫ অক্টোবর ২০২৬,
২০ আশ্বিন ১৪৩৩
Advertisement
অপরাধ
নিউগিনিতে ২০০ জনের তাণ্ডব, গুলির নিশানায় পুলিশও
খাবারের দোকানে হামলার ছক, দুই বাহিনীতে লোক
নেপথ্যে ৩৫ কাঠা জমি-রাস্তার বিরোধ
খন্দকার হানিফ রাজা
⏲ ৯:১৪ পিএম | ৫ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবার
সংগৃহীত ছবি
দুপুরে খাবারের দোকানে বৈঠক, বিকেলে দুই এলাকায় লোক জড়ো, সন্ধ্যার পর পাঁচ পিকআপে ও হেঁটে অস্ত্র হাতে রওনা—আর রাত সাড়ে ১০টায় নিউগিনি আবাসন প্রকল্পের মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা। প্রায় ২০০ মানুষের এই সশস্ত্র তাণ্ডবের একপর্যায়ে গুলির নিশানা করা হয় ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া ছয় পুলিশ সদস্যকেও। রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি প্রপার্টিজে গত ২৬ সেপ্টেম্বরের হামলার তদন্তে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মতে, ৩৫ কাঠা জমি ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধ থেকেই তৈরি হয় হামলার পরিকল্পনা।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হামলার আগে ইসিবি চত্বরে একটি খাবারের দোকানে বৈঠক হয়। সিসিটিভিতে বৈঠকে ১৩ জনকে দেখা যায়। তাঁদের মধ্যে গ্রেপ্তার শাহরিয়ার মাহমুদ ও ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহকে শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ১১ জনকে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পুলিশের ধারণা, ওই বৈঠকেই হামলার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়।

বিকেল ৪টার দিকে ভাসানটেকের দেওয়ানপাড়া দুইতলা মসজিদের সামনের মাঠে এবং মানিকদিতে লোক জড়ো করা হয়। পরে পাঁচটি পিকআপ ও হেঁটে প্রায় ২০০ মানুষ নিউগিনির দিকে যায়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মূল ফটকে গুলি ছুড়ে হামলা শুরু হয়।

পুলিশের ভাষ্য, হামলায় মিরপুরের দুটি অপরাধী চক্রের সদস্যরা অংশ নেয়। একটি চক্রের নেতৃত্বে ভাসানটেক থানা বিএনপির আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইব্রাহিম, যাকে পুলিশের তালিকায় ‘কিলার ইব্রাহিম’ বলা হয়। অন্যটির নেতৃত্বে পল্লবীর মোফিজুর রহমান মামুন। ইব্রাহিমের লোকজনের সংখ্যা বেশি ছিল বলে তদন্তে জানা গেছে।

হামলাকারী সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহকে। শাহ আলম আনিকের মাধ্যমে তিনি ইব্রাহিম ও মোফিজুর রহমান মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শাহ আলম আনিক মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। তাঁদের লোকজন ভাড়াটে হামলাকারী হিসেবে অংশ নেয় বলে অভিযোগ।

স্থানীয়রা জানান, দেওয়ানপাড়া দুইতলা মসজিদের সামনে ইব্রাহিমের একটি ব্যবসায়িক কার্যালয় রয়েছে। হামলার দিন সেখানে ভাসানটেক বস্তি ও পল্লবী থেকে লোকজন জড়ো করা হয়। ইব্রাহিমের সহযোগী মাসুম ওরফে ফর্সা মাসুম তাঁদের নিউগিনিতে নিয়ে যান বলে অভিযোগ। হামলাকারীদের বড় অংশই ভাসানটেক বস্তির। ঘটনাস্থল থেকে আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেপ্তার দুজনও ওই এলাকার বাসিন্দা ও ইব্রাহিমের অনুসারী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইব্রাহিমের অনুসারী যুবরাজ, শাহেদ, শাকিল, রূপচান, বাবলু ও বুকপোড়া সুমনেরও হামলায় সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। ভাসানটেকে বিভিন্ন অপরাধে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় এক ভবনমালিক অভিযোগ করেন, ভাসানটেকে নির্মাণকাজ শুরু হলেই ইব্রাহিমের লোকজন মাটি ভরাট এবং ইট, বালু, সিমেন্ট কিনতে চাপ দেয়। তাঁর ক্ষেত্রেও রাজি না হওয়ায় নির্মাণাধীন ভবনের সামনে গুলি ছোড়া হয়। পরে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী কিনতে বাধ্য হন তিনি।

হামলায় মোফিজুর রহমান মামুনের চক্রের সদস্যরাও অংশ নেয় বলে পুলিশের দাবি। মিরপুর ও আশপাশে জবরদখলের কাজে ভাড়াটে শক্তি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। মোফিজুর রহমান মামুন ছিলেন পল্লবী থানা ৯১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি। হত্যা, জমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে গত মঙ্গলবার তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। তবে মামলায় গ্রেপ্তার ‘মামুন’ এবং এই চক্রের প্রধান মোফিজুর রহমান মামুন একই ব্যক্তি নন।

হামলার সময় ছয় পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়া হয়। কারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করেছে, তা এখনো শনাক্ত হয়নি। এজাহারে প্রায় ৫০ রাউন্ড গুলি ছোড়ার কথা বলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ পাঁচ রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে জানিয়েছে।
হামলার সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। তিনি সেদিন রাতে ভিডিও প্রকাশ করলে তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। গত বুধবার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাঁর ব্যাংক হিসাব ও লেনদেনের তথ্য চেয়েছে। এ বিষয়ে সালমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নিউগিনির পাশের ৩৫ কাঠা জমিই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। তিন পাশে স্থানীয় বাড়িঘর, এক পাশে নিউগিনি। ওই জমি থেকে বের হওয়ার জন্য নিউগিনির রাস্তা ব্যবহারের অধিকার নিয়েই বিরোধ।

নিউগিনির মালিক নাজিম উদ্দিন ভূঁইয়া ২০১১ সালে ক্যান্টনমেন্ট থানার ইসিবি চত্বরে জমি কেনা ও আবাসন ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে প্রকল্পটি ১০ থেকে ১২ বিঘা। তাঁর দাবি, ৩৫ কাঠার মধ্যে ১৫ কাঠা গোলাম মোহিউদ্দিন চৌধুরীর কাছ থেকে কেনেন। জমি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের পর ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর সেটি হামলা চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়। নাজিমের অভিযোগ, গোলাম মোহিউদ্দিন জমি বুঝিয়ে না দিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণের ঘোষণা দেন এবং নিউগিনির রাস্তা ব্যবহার করতে চান। এতে আপত্তি করায় ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা চালানো হয়।

তবে জমি নিয়ে নাজিমের বিরুদ্ধেও মামলা রয়েছে। গত জুলাইয়ে মিজানুর রহমান ক্যান্টনমেন্ট থানায় অভিযোগ করেন, ৮ দশমিক ৫ কাঠা জমি অন্যের কাছে বিক্রি করে পুরো টাকা পরিশোধ করা হয়নি। ২০২৪ সালের চুক্তিতে জমির মূল্য ছিল ৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা; নাজিম ১ কোটি টাকা দেন, বাকি ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাঁচ মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও তা পরিশোধ না করে জমি অন্যের কাছে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ।

রাজনৈতিক প্রভাব ও জমি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাজিম। তাঁর দাবি, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করেছে। ২০২২ সালে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ঢাকার বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তিনি কারাগারে ছিলেন। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও ক্যান্টনমেন্ট থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর তাঁকে আওয়ামী লীগের সহযোগী আখ্যা দিয়ে মামলা করা হচ্ছে বলে তাঁর অভিযোগ।

হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় গ্রেপ্তার সাতজন হলেন—অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মোহিউদ্দিন চৌধুরী, মিজানুর রহমান, শাহরিয়ার মাহমুদ, শাহ আলম, মামুন, আসলাম ও মুন্না। গত বুধবার মামলার ৪ নম্বর আসামি অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মোহিউদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। পুলিশ জানিয়েছে, সাতজনই রিমান্ডে রয়েছেন।

ক্যান্টনমেন্ট থানা থেকে মামলার তদন্ত ডিবির গুলশান বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে। ডিবি গুলশানের উপকমিশনার এ এফ এম আনোয়ার হোসেন বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই হামলার ঘটনা ঘটেছে। সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হামলার পরিকল্পনাকারী, অংশগ্রহণকারী এবং অস্ত্র সরবরাহকারীদের শনাক্তে তদন্ত চলছে। কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে।

ঠিকাদার বিকাশ চন্দ্র শাহ পলাতক। তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ইব্রাহিম ও মোফিজুর রহমান মামুনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।



জ/বা


  বিষয়:   অপরাধ  হামলা  গুলি 


Advertisement
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত